ভাঙা পালক ✒️
দিগন্ত জার্নাল সাহিত্য ✒️
আলিফা বলেছিল— “আমি দোষী নই!”
কিন্তু তার কথাগুলো যেন বাতাসেই মিশে গেল…
[ মঙ্গলবার, ২৯ এপ্রিল ৩০২৫ খৃষ্টাব্দ ]
রুদ্রপুরের শেষ প্রান্তে এক গ্রাম—বাঁশঝাড়।
চারপাশে নিস্তব্ধতা, যেন সময় থমকে গেছে। ধানক্ষেতের কচি সবুজ, নদীর পাড়ে জেগে থাকা বটগাছ, আর মানুষের চোখে লুকানো এক বেদনার ছায়া। সেইখানে জন্মেছিল এক কিশোরী—আলিফা।
আলিফা ছিল স্বপ্নবাজ। চোখে তার ছিল দূর আকাশ ছোঁয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা। বইয়ের পাতায় সে খুঁজে পেত মুক্তির স্বাদ। যখন সমাজ বলত,
“মেয়েদের এত পড়াশোনা করেই বা কী হবে?”
আলিফা নির্ভর কণ্ঠে বলত—
“স্বপ্নের তো কোনো দেয়াল হয় না।”
তার আপন জগৎ ছিল গ্রামের পুকুরপাড়, মাটির রাস্তা, আর নদীর ধারে ছড়ানো নরম বাতাস। প্রতিদিন নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে সে ভাবত—
একদিন উড়বো, ঠিকই উড়বো!
কিন্তু এক রাতে সব বদলে গেল।
গ্রামের বাতাসে ভেসে এলো চাপা এক আর্তনাদ।
পরদিন সকালের সূর্য আর আগের মতো ছিল না। গুজব ছড়িয়ে পড়ল—
“আলিফা কলঙ্কিত হয়েছে!”
কেউ জানার চেষ্টা করল না—
কেন? কীভাবে? কারা?
অপরাধীরা থেকে গেল ধরাছোঁয়ার বাইরে।
সমাজ তাক করল একটাই দিকে—আলিফার দিকে।
তার স্বপ্নে নেমে এলো অভিশপ্ত অন্ধকার।
বন্ধুরা সরে গেল, শিক্ষক মুখ ঘুরিয়ে নিল, আত্মীয়রা নির্বাক।
“মেয়েদের বেশি উড়তে নেই,”
বলল এক প্রতিবেশী।
“চুপ থাকাই ভালো,”
বলল আরেকজন।
আলিফা বলেছিল—
“আমি দোষী নই!”
কিন্তু তার কথাগুলো যেন বাতাসেই মিশে গেল।
কেউ পাশে দাঁড়াল না।
একদিন ক্লান্ত, ক্ষতবিক্ষত হৃদয়ে সে হাঁটল নদীর পাড়ে,
যে নদী একদিন তাকে মুক্তির গান শোনাতো।
সেদিন বাঁশঝাড়ের আকাশ ছিল কুয়াশায় ঢেকে।
পুরনো বটগাছের নিচে পড়েছিল নিথর শরীরটা।
একটা ভাঙা পালক, যেন স্বপ্নের শেষ চিহ্ন।
তার দেহ মাটিতে থাকলেও, তার স্বপ্নেরা নদীর স্রোতে ভেসে যাচ্ছিল।
গ্রাম আবার ব্যস্ত হলো নিজেদের দায় এড়াতে।
কেউ বলল—
“আমরা তো কিছু জানি না।”
পুলিশ এলো, লোক দেখানো তদন্ত,
তারপর আবার নিস্তব্ধতা।
কিন্তু বাঁশঝাড়ের বাতাস আজও কাঁদে…
নদীর ঢেউ ফিসফিস করে বলে—
“আলিফা…”
আলিফা (হাওয়ার মতো নরম স্বরে):
“আমি তো শুধু বাঁচতে চেয়েছিলাম…
আমি তো শুধু উড়তে চেয়েছিলাম…
কেন ভেঙে দিলে আমার পালক?
কে বলবে আজ—আমি কি দোষী ছিলাম?”
“ভাঙা পালক” শুধু আলিফার গল্প নয়, এটা সমাজের নির্বাক নিষ্ঠুরতার প্রতিচ্ছবি।
যেখানে সত্য চাপা পড়ে, অপরাধ বুক ফুলিয়ে হাঁটে।
এই গল্প কাঁদায়, জাগায়—
আমরা কি আরেকটি আলিফাকে হারাতে চাই?”
রচয়িতা: ইউনুস খান,
কবি, আবৃত্তিকার, সংবাদিক, চিন্তক, গবেষক, সম্পাদক ✒️