ইয়ানার চিঠি ✒️ - দিগন্ত জার্নাল

ইয়ানার চিঠি ✒️

দিগন্ত জার্নাল সাহিত্য ✒️বুধবার, ৩০ এপ্রিল ২০২৫


আমি ফিরবো—সত্যের স্বাক্ষর হয়ে
“স্যার, সিসিটিভি ফুটেজ চেক করুন… আমি নির্দোষ।”

কিন্তু সেদিন কেউ তার কথা শোনেনি।
নিঃশব্দ এক ভোর।

প্ল্যাটফর্মজুড়ে মানুষের ব্যস্ততা, ছুটে চলা পায়ের শব্দ, বিদায়ের দীর্ঘশ্বাস—সবকিছুর মাঝেও দাঁড়িয়ে ছিল একটি মেয়ে। তার চোখের কোণে জমে ছিল গভীর জল, অথচ ঠোঁটে লেগে ছিল এক অদ্ভুত, অস্পষ্ট হাসি।

তার নাম—ইয়ানা তামান্না।

কাঁধে একটি ব্যাগ। হাতে বাবার হাত। আর বুকের ভেতর—অসংখ্য ভাঙা স্বপ্নের ধ্বংসস্তূপ থেকে জন্ম নেওয়া নতুন এক পৃথিবী।

আজ সে দেশ ছেড়ে যাচ্ছে।

কিন্তু পালিয়ে যাচ্ছে না।

সে যাচ্ছে—ফিরে আসার প্রতিশ্রুতি নিয়ে।

কয়েক দিন আগেও ইয়ানা ছিল স্বপ্নে ভরা এক তরুণী। তার চোখে ছিল আকাশ ছোঁয়ার আকাঙ্ক্ষা, আর হৃদয়ে ছিল মানুষের পাশে দাঁড়ানোর অদম্য বিশ্বাস।

সে আইন নিয়ে পড়তে চেয়েছিল।

কারণ ইয়ানা বিশ্বাস করত—

“যেখানে অন্যায় শক্তিশালী হয়ে ওঠে, সেখানে সত্যের পক্ষে দাঁড়ানোর জন্য একজন সাহসী মানুষের প্রয়োজন হয়।”

একটি বছর…

প্রতিটি রাত ছিল তার নির্ঘুম সংগ্রাম।
প্রতিটি সকাল ছিল নতুন করে নিজেকে গড়ে তোলার প্রস্তুতি।

বাবা প্রায়ই বলতেন—

“তোর চোখে আমি আলো দেখি, ইয়ানা।
সত্যের আলো।”

ইয়ানা তখন মৃদু হাসত।

সে জানত না—সত্যের পথেও কখনো কখনো সবচেয়ে নির্মম অন্ধকার নেমে আসে।

সেই পরীক্ষা।

সেই সকাল।

সবকিছুই ছিল স্বাভাবিক।

ইনায়ার ফাইনাল পরিক্ষা, ঠিক সময়েই সে চলে এসেছে পরিক্ষার হলে ।

ইনায়া নিজের খাতায় মনোযোগ দিয়ে লিখছিল। পাশের বেঞ্চে বসা একটি মেয়ে বারবার তার খাতার দিকে তাকাচ্ছিল। হয়তো নকল করার চেষ্টা করছিল।

ইয়ানা তাকে উপেক্ষা করেছিল।

নিজের স্বপ্ন নিয়ে ব্যস্ত ছিল সে।

কিন্তু হঠাৎ—

একজন শিক্ষক ঝড়ের মতো এসে দাঁড়ালেন তার সামনে।

এক মুহূর্তে কেড়ে নিলেন খাতা।

তারপর কঠিন কণ্ঠে বললেন—

“তুমি বেঞ্চের নিচে নকল রেখেছো!”

ইয়ানার পৃথিবী যেন থেমে গেল।

চোখ দুটো বিস্ময়ে বড় হয়ে উঠল।

সে বলেছিল—

“স্যার, আমি করিনি…”

কিন্তু তার কথা বাতাসে মিলিয়ে গেল।

তারপর সে আবার বলেছিল—

“স্যার, সিসিটিভি ফুটেজ চেক করুন। আমি নির্দোষ।”

কিন্তু কেউ শোনেনি।

কেউ থামেনি।

কেউ জানতে চায়নি—সত্যটা আসলে কী।

লাল কালির একটি দাগ টেনে দেওয়া হলো তার খাতায়।

একটি দাগ!

কিন্তু সেই দাগ যেন শুধু খাতায় পড়েনি—

পড়েছিল তার স্বপ্নে।

তার সম্মানে।

তার ভবিষ্যতে।

একটি নির্দোষ মেয়ের জীবনে।

খবর ছড়িয়ে পড়ল।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে।

সংবাদপত্রে।

মানুষের মুখে মুখে।

একটি নাম উচ্চারিত হতে লাগল—

ইয়ানা তামান্না ।

কেউ বলল—

“নকল করতে গিয়েছিল।”

কেউ বলল—

“মেয়েটি নির্দোষ।”

কেউ আবার বলল—

“সত্যের জন্য প্রতিবাদ করেছে।”

কিন্তু মানুষের হাজারো কথার ভিড়ে হারিয়ে গেল একটি প্রশ্ন—

সত্যিই কি কেউ জানার চেষ্টা করেছিল সত্যটা?

কোনো কথাই মুছে দিতে পারেনি সেই লাল দাগ।

আর কিছু দাগ আছে—

যা কাগজে নয়,

মানুষের হৃদয়ে বসে যায়।

ইয়ারার বাবা ছিলেন একজন আইনজীবী।

তবুও ইয়ানা কখনো বাবার পরিচয়ে বড় হতে চায়নি।

সে চেয়েছিল—

নিজের নাম নিজেই লিখতে।

নিজের পরিচয় নিজেই তৈরি করতে।

একদিন বাবাকে জড়িয়ে ধরে সে বলেছিল—

“বাবা, আমি হেরে গেছি।”

বাবা কিছুক্ষণ চুপ করে ছিলেন।

তারপর মেয়ের মাথায় হাত রেখে বলেছিলেন—

“না মা, তুই হারিসনি।
তুই শুধু পড়ে গেছিস।
আর যে পড়ে গিয়েও উঠে দাঁড়াতে জানে—সে কখনো হারে না।
আমি জানি, তুই আবার জ্বলবি।
কারণ তোর ভেতরে এখনো সত্য বেঁচে আছে।”

সেদিন ইয়ানা কেঁদেছিল।

খুব কেঁদেছিল।

কিন্তু সেই কান্নার ভেতরেই হয়তো জন্ম নিয়েছিল নতুন এক ইনায়া।

আরও শক্ত।

আরও সাহসী।

আরও অদম্য।

তারপর শুরু হলো নীরব প্রস্তুতি।

নিজের ছোট শহরের কয়েকজন মেয়েকে নিয়ে ইয়ানা শুরু করল এক ছোট্ট উদ্যোগ—

“ন্যায় ও নৈতিকতার পাঠশালা।”

সেখানে সে শুধু বই পড়াত না।

সে শেখাত—

নিজের অধিকার জানতে।

অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলতে।

সত্যকে ভয় না পেতে।

সে বলত—

“মানুষের সবচেয়ে বড় শক্তি তার কণ্ঠ।
আর সেই কণ্ঠ যখন সত্যের পক্ষে কথা বলে—তখন তাকে থামানো যায় না।”

আজ সেই ইয়ানা দেশ ছেড়ে যাচ্ছে।

আইনশাস্ত্রে উচ্চশিক্ষা নিতে।

তার উদ্দেশ্য একটাই—

একদিন সে ফিরে আসবে।

ফিরে এসে অন্যায়কে দাঁড় করাবে আইনের কাঠগড়ায়।

যে সমাজ একদিন তার কথা শোনেনি—

একদিন সেই সমাজের সামনেই সে দাঁড়াবে।

কিন্তু প্রতিশোধ নিয়ে নয়।

সে ফিরবে—

ন্যায় নিয়ে।

সত্য নিয়ে।

আইনের শক্তি নিয়ে।

বিমানের জানালার পাশে বসে ইয়ানা একটি চিঠি লিখছিল।

চিঠিটি কারও কাছে পাঠানোর জন্য নয়।

চিঠিটি নিজের জন্য।

সমাজের জন্য।

আর সেই সব নারীর জন্য—

যারা সত্য বলার অপরাধে অপমানিত হয়েছে।

যাদের স্বপ্ন ভেঙে দেওয়া হয়েছে।

যাদের কণ্ঠস্বর চাপা দিতে চেয়েছে পৃথিবী।

চিঠির শেষে সে লিখল—

**“আমার পথ থেমে যায়নি, শুধু পথটি একটু বাঁক নিয়েছে।

আমি ফিরবো—উকিলের পোশাকে, কলম হাতে, সত্যকে সঙ্গে নিয়ে।**

**একদিন সমাজ বুঝবে—একজন মেয়ে শুধু কারও ছায়া নয়।

সেও আলো হতে পারে।
যখন তার হাতে থাকে জ্ঞানের শক্তি, হৃদয়ে থাকে সাহস, আর কলমে থাকে সত্যের স্বাক্ষর।”**

ইয়ানার চোখের কোণে তখনও জল।

কিন্তু সেই জল আর দুর্বলতার নয়।

সেই জল—

নতুন পথের।

নতুন স্বপ্নের।

নতুন যুদ্ধের।

বিমানটি ধীরে ধীরে আকাশের দিকে উঠতে লাগল।

আর মাটির পৃথিবী ছোট হতে হতে একসময় মিলিয়ে গেল দূরত্বে।

ইয়ারা জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল।

তার চোখে তখন একটাই প্রতিশ্রুতি—

“আমি ফিরবো…”

হয়তো সেই একই শহরে।
হয়তো সেই একই মানুষের কাছে।
কিন্তু এবার আর কেউ বলবে না—
‘তোমার কথা কেউ শুনবে না।’

কারণ এবার—

তার হাতে থাকবে আইন।
তার কণ্ঠে থাকবে সত্য।
আর তার কলমে থাকবে—ন্যায়ের স্বাক্ষর।

এই গল্প শুধু ইনায়ার নয়।

এই গল্প পৃথিবীর প্রতিটি সাহসী নারীর—

যারা অপমানের পরও ভেঙে পড়ে না,

যারা অন্যায়ের সামনে মাথা নত করে না,

যাদের স্বপ্নকে থামিয়ে দিতে চাইলেও—

তারা আবার নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শেখে।

কারণ কিছু মানুষ হারিয়ে যায় না—
তারা শুধু সময়ের কাছে একটু থামে,
তারপর ফিরে আসে আরও শক্তিশালী হয়ে।

ইয়ানাও ফিরবে।

একদিন—
সত্যের স্বাক্ষর হয়ে।

✒️ রচয়িতা: ইউনুস খান
কবি | সাংবাদিক | আবৃত্তিকার | চিন্তক | গবেষক | সম্পাদক

an adbox will go here