ইয়ানার চিঠি ✒️
দিগন্ত জার্নাল সাহিত্য ✒️
ইনায়া বলেছিল,“স্যার, সিসিটিভি ফুটেজ চেক করুন। আমি নির্দোষ।” কিন্তু কেউ শোনেনি।
বুধবার, (৩০ এপ্রিল, ২০২৫) নিঃশব্দ ভোর। প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে একটি মেয়ের চোখে গভীর জল, অথচ ঠোঁটে অস্পষ্ট এক হাসি। নাম তার ইনায়া। চোখে ছিল আকাশছোঁয়ার স্বপ্ন, হৃদয়ে ছিল অদম্য বিশ্বাস—মানুষের পাশে দাঁড়াবার, অন্যায়ের প্রতিবাদ করার, নিজেকে গড়ে তোলার। অথচ আজ… সে দাঁড়িয়ে আছে দেশ ছেড়ে যাওয়ার প্রহরে, কাঁধে ব্যাগ, হাতে বাবার হাত।
ক’দিন আগেও ইনায়া ছিল ভীষণ আশাবাদী। আইন নিয়ে পড়তে চেয়েছিল সে, কারণ সে বিশ্বাস করত— সমাজে ন্যায় প্রতিষ্ঠা করতে হলে একজন সাহসী কণ্ঠ দরকার।
এক বছর ধরে প্রতিটি রাত ছিল তার জেগে থাকা, সকাল ছিল আত্মপ্রস্তুতির অধ্যায়।
বাবা বলতেন, “তোর চোখে আমি আলো দেখি, ইনায়া। সত্যের আলো।”
সেই পরীক্ষা। সেই সকাল। সব কিছুই ছিল সঠিক পথে। কিন্তু ভুলটা শুরু হয়েছিল অন্য কারো কারণে।
পরীক্ষার হলে পাশের একটি মেয়ে ইনায়ার খাতা দেখে নকল করার চেষ্টা করছিল। ইনায়া পাত্তা না দিয়ে নিজের কাজ করছিল। হঠাৎ এক শিক্ষক ঝড়ের মতো এসে তার খাতা কেড়ে নিয়ে বললেন,
“তুমি বেঞ্চের নিচে নকল রেখেছো!”
সেই মুহূর্তে ইনায়ার চোখে যেন বিস্ময়ের বিস্ফোরণ ঘটলো। শত অনুনয়েও শিক্ষক কিছু শুনলেন না। লাল কালি দিয়ে খাতায় দাগ টানলেন—ঠিক যেন কোনো অপরাধীর রায় লেখা হলো।
ইনায়া বলেছিল,
“স্যার, সিসিটিভি ফুটেজ চেক করুন। আমি নির্দোষ।”
কিন্তু কেউ শোনেনি। কেউ বোঝেনি—একটি নির্ভীক মেয়ের সম্মান কীভাবে মুহূর্তে মাটিতে গড়িয়ে পড়ে।
খবর ছড়িয়ে পড়ে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, সংবাদপত্র—সব জায়গায় উচ্চারিত হতে লাগল একটি নাম—ইনায়া তাহমিনা। কেউ বলল, “চুরি করতে গিয়েছিল,” কেউ বলল, “সাহসী মেয়ে, অন্যায়ের প্রতিবাদ করেছিল।”
কিন্তু কোনো কথাই তার জীবন থেকে সেই লাল দাগ মুছতে পারেনি।
ইনায়ার বাবা ছিলেন একজন আইনজীবী।
কিন্তু ইনায়া কখনো তার বাবার ছায়ায় দাঁড়াতে চায়নি। চেয়েছিল, নিজের ছায়া নিজেই তৈরি করতে।
সেদিন বাবাকে জড়িয়ে ধরে বলেছিল,
“বাবা, আমি হেরে গেছি।”
বাবা কেবল বলেছিলেন,
“তুই পড়ে গেছিস, তবে উঠতেও জানিস। আমি জানি, তুই জ্বলবি আবার। তোর আত্মা এখনো ন্যায়ের দিকে আছে।”
তারপর… নীরব প্রস্তুতি। ইনায়া তার ছোট শহরের মেয়েদের নিয়ে শুরু করল এক উদ্যোগ—ন্যায় ও নৈতিকতার পাঠশালা। সে তাদের শেখাতে লাগল অধিকার, প্রতিবাদ, সত্যের ভাষা।
আজ সে দেশের বাইরে যাচ্ছে—আইনশাস্ত্রে উচ্চশিক্ষা নিতে। উদ্দেশ্য একটাই—একদিন ফিরে এসে অন্যায়কে আইনের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো।
শেষ দৃশ্য—
প্লেনের জানালার পাশে বসে ইনায়া লিখছে একটি চিঠি—নিজের জন্য, সমাজের জন্য, সেই সব নারীর জন্য যারা সত্য বলার অপরাধে নিঃস্ব হয়ে পড়ে—
“আমার পথ থেমে যায়নি, শুধু বাঁক নিয়েছে। আমি ফিরবো—উকিলের পোশাকে, কলম হাতে। সমাজ বুঝবে—একজন মেয়ে শুধু ছায়া নয়, সে-ও আলো হয়ে উঠতে পারে, যখন তার হাতে থাকে সত্যের স্বাক্ষর।”
এই গল্প শুধু ইনায়ার নয়—সমস্ত সাহসী নারীর কণ্ঠস্বর, যারা ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ায়, যাদের প্রতিবাদ থেমে যায় না অপমানের মুখে।
রচয়িতা: ইউনুস খান ✒️
কবি, সাংবাদিক, আবৃত্তিকার, চিন্তক, গবেষক, সম্পাদক ✒️