ঘাম যেখানে ফুল ফোটায় ✒️
দিগন্ত জার্নাল সাহিত্য ✒️
তবু আজকের আকাশটা অন্যরকম। করিমের ঘামে ভিজে থাকে একটা অদৃশ্য পঙক্তি—
“ঘাম যেখানে ঝরে, সেখানেই ফুল ফোটে।”
বৃহস্পতিবার, ০১ মে ২০২৫
ভোর পাঁচটা। সূর্য তখনো ঘুমে ঢুলছে, আকাশের গায়ে লেগে আছে লালচে আবছা রঙ—ঠিক যেন শ্রমিকের ক্লান্ত হাতের ঘামে রঙ ধরা গেঞ্জি। শহরের ধুলা-ওঠা এক কোণে চায়ের দোকান, সেখানে কয়েকটি শরীর বসে আছে—ঘুমের শেকলে বাঁধা চোখ, ভোরের হিমে কুঁচকে যাওয়া মুখ, কিন্তু তাতে হেরে যায়নি তাদের যাত্রার সংকল্প।
এই ভোরের পাতায় করিম মিস্ত্রির নাম লেখা থাকে প্রতিদিন। হাতে লোহার হাতুড়ি, কোমরে গুঁজে রাখা ফিতে—সে যেন এক জীবন্ত চিত্রশিল্পী, ইটের ফ্রেমে আকঁছে ভবিষ্যতের কাঠামো। আজ মে দিবস, কিন্তু করিমের ছুটির কোনো পাণ্ডুলিপি নেই। তার প্রতিদিনই কাজ, কারণ ঘামে ভেজা প্রতিটি দিন তার মায়ের ইনসুলিন, বোনের স্কুল ফি আর ছেলের তোতলানো স্বপ্নের ইট।
দুপুরের রোদে করিম যখন ভাঙা থালায় ভাত তোলে মুখে, তখন পাশ দিয়ে হেঁটে যায় এক নেতা। ক্যামেরার ঝলক, গলায় মাইক, মুখে প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরি—“শ্রমিকের ঘামেই দেশ গড়ে ওঠে!” করিম চুপচাপ শোনে, কারণ সে জানে, এসব শব্দ তার হাতের ফোস্কা শুকায় না।
তবু আজকের আকাশটা অন্যরকম। করিমের ঘামে ভিজে থাকে একটা অদৃশ্য পঙক্তি—
“ঘাম যেখানে ঝরে, সেখানেই ফুল ফোটে।”
বিকেলে ছাদে দাঁড়িয়ে করিম পকেট থেকে ছেলের আঁকা এক টুকরো কাগজ বের করে—একজন শ্রমিক, মাথায় হেলমেট, পেছনে সূর্য, আর নিচে লেখা:
“আমার বাবা গড়ে তোলে ঘর।”
সে জানে, ইতিহাস কোনোদিন তার নাম হয়তো স্মরণ করবে না, কিন্তু প্রতিটি জানালার ফ্রেমে, প্রতিটি স্তম্ভের গায়ে তার নাম লেখা থাকবে—অদৃশ্য কালিতে, ঘামের অক্ষরে।
আজ মে দিবস। আর করিম?
সে এক জীবন্ত কবিতা, কলমহীন কবি,
যার প্রতিটি হাতুড়ির আঘাতে জন্ম নেয় গাথা—
যেখানে ঘামেই ফুটে ওঠে নির্মাণের ফুল।
রচয়িতা: ইউনুস খান _
কবি, সংবাদিক, আবৃত্তিকার, চিন্তক, গবেষক, সম্পাদক ✒️