ঐতিহাসিক শাপলা ট্রাজেডির যুগপূর্তিশহীদদের স্মরণে আমার শপথ__ ইউনুস খান - দিগন্ত জার্নাল

ঐতিহাসিক শাপলা ট্রাজেডির যুগপূর্তিশহীদদের স্মরণে আমার শপথ__ ইউনুস খান

দিগন্ত জার্নাল

সোমবার, (৫ মে ২০২৫) আজ ঐতিহাসিক শাপলা ট্রাজেডির যুগপূর্তিতে আমি ইউনুস খান, একজন প্রত্যক্ষ সাক্ষী হিসেবে মহান রাব্বুল আলামিনের দরবারে ২০১৩ সালের ৫ই মে’র শাপলা চত্বরে শহীদ হওয়া সহ হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের পথচলায় আজ পর্যন্ত সকল শহীদদের রূহের মাগফিরাত কামনা করছি। আল্লাহ যেন তাঁদের সবাইকে জান্নাতুল ফেরদৌসের সর্বোচ্চ মাকাম দান করেন—এই প্রার্থনা আমাদের অন্তরের গভীর থেকে।

উল্লেখ্য, শাপলা চত্বরসহ হেফাজতের সকল শহীদের বিস্তারিত পরিচয়সহ একটি প্রামাণ্য তালিকা তৈরির কাজ আমাদের হেফাজতে ইসলামের মুরুব্বীরা করবেন বলে আমরা দৃঢ় আশা রাখি। এসব বর্বর হত্যাকাণ্ডের দৃষ্টান্তমূলক বিচার এবং হেফাজত সংশ্লিষ্ট সারাদেশের সকল বি’রো’ধী মা’মলা প্রত্যাহারের দাবিতে আন্দোলন আগামী দিনে আরও কঠোর, আরও সোচ্চার হবে—ইনশাআল্লাহ।

সাম্প্রতিক ৩ মে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ঐতিহাসিক মহাসমাবেশ সফল করায় হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের সকল পর্যায়ের দায়িত্বশীল, কর্মী, সমর্থক ও শুভানুধ্যায়ীদের প্রতি জানাই অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে কৃতজ্ঞতা ও অভিনন্দন। এই ঐক্যই আমাদের শক্তি, এই শৃঙ্খলাই আমাদের পথের পাথেয়।

আল্লাহ আমাদের সবাইকে সব বিভক্তি ও অসঙ্গতি দূর করে পারস্পরিক আস্থা, নিয়মতান্ত্রিকতা এবং সৌহার্দ্যপূর্ণ ঐক্যের উপর অবিচল থাকার তৌফিক দিন—যাতে আমরা দেশ, জাতি, দ্বীন ও ঈমানের পক্ষে চিন্তা, চেতনা ও সংগ্রাম অব্যাহত রাখতে পারি।

আমি ইউনুস খান—শাপলা ট্রাজেডির একজন জীবন্ত সাক্ষী। ২০১৩ সালের সেই বিভীষিকাময় দিনটি আজও চোখে ভাসে। আমি ও আমার শৈশবের বন্ধু, বর্তমানে মাওলানা মুফতি ও একজন জামিয়ার শাইখুল হাদীস, লুৎফুর রহমান—আমরা নেত্রকোনা থেকে রেলযোগে গাজীপুরে পৌঁছাই ৫ তারিখের আগেই। গোপনে আশ্রয় নিই গাজীপুরের এক অজানা স্থানে। ৫ মে নেত্রকোনা জেলা হেফাজতের কাফেলায় আমি, আল্লামা তাহের কাসেমী ও অন্যান্য নেতৃত্বে গাজীপুর থেকে রওনা হই শাপলা চত্বরের দিকে।

আব্দুল্লাহপুরে আমাদের কাফেলাকে বাধা দেওয়া হয়, কিন্তু আমরা দুপুরের পর সেই বাধা অতিক্রম করে এগিয়ে চলি ঢাকার কেন্দ্রভাগের দিকে। পল্টন মোড় থেকে শান্তিনগর পর্যন্ত বিস্তৃত জনস্রোতের মাঝে আমি নিজ চোখে দেখেছি—বুলেটবিদ্ধ শত শত দেহ, রক্তাক্ত মানুষ। আমরা পিছপা হইনি। বরং আরও দৃঢ় মনোবলে আমরা শহীদ হওয়ার আকাঙ্ক্ষা হৃদয়ে ধারণ করেছিলাম।

সন্ধ্যার আগে পল্টনের যে চিত্র দেখেছি, তা যদি এত ভয়ংকর হয়, তবে রাত গভীর হলে সে দৃশ্য কতটা বিভীষিকাময় হয়েছিল—তা অনুমান করাই যথেষ্ট। হাজার হাজার মানুষ শহীদ হয়েছেন—এ এক নির্মম গণহত্যা। আমরা কালের সাক্ষী। আর সেই হত্যার বিচার না পাওয়া পর্যন্ত আমরা থামবো না, আর চুপ থাকবো না।

তবে ইতিহাসের এই গভীরতম ক্ষতের পাশে দাঁড়াতে অনেকে পারেননি। বিএনপি সেদিন যে সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, বাস্তবে তারা তা রক্ষা করেনি। নিরবতা, পিছু হটা ও আত্মঘাতী কৌশলের কারণে তারা গণমানুষের এই রক্তাক্ত প্রহর থেকে নিজেদের গুটিয়ে নিয়েছিল।

আরও করুণ বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশের ৯৫ থেকে ৯৭ শতাংশ গণমাধ্যম সেদিন হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের এই নির্মম গণহত্যাকে আড়াল করেছে। তারা ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারের রক্তচক্ষু ও ক্ষমতালোভের কাছে নতজানু হয়ে পড়ে। সাংবাদিকতা ও সত্যপ্রকাশের মহান দায়িত্বকে ত্যাগ করে, তারা আওয়ামী লীগের প্রোপাগান্ডা যন্ত্রে পরিণত হয়েছিল।

তবে আমরা জানি, সত্য চাপা থাকলেও একদিন মাথা তোলে দাঁড়ায়। শহীদদের রক্ত বৃথা যাবে না। ইতিহাসের বিচার একদিন হবেই—ইনশাআল্লাহ।

শপথ করছি—আমরা শহীদের রক্তের ঋণ ভুলবো না।
ইনসাফ না পাওয়া পর্যন্ত আমাদের লড়াই চলবে।

— ইউনুস খান
সাক্ষী, শাপলা ট্রাজেডি (৫ মে ২০১৩ খৃষ্টাব্দ)

an adbox will go here