সম্মানের পথে শিক্ষার আত্মসচেতন অবস্থান: শায়েখ আবুল বাশার মুহাম্মদ সাইফুল ইসলাম - দিগন্ত জার্নাল

সম্মানের পথে শিক্ষার আত্মসচেতন অবস্থান: শায়েখ আবুল বাশার মুহাম্মদ সাইফুল ইসলাম

শায়খুল হাদীস, জামিয়াতুল উলূমিল ইসলামিয়া, ঢাকা


উপসম্পাদকীয় কলাম✍️


শুক্রবার , ১৬ মে ২০২৫ | কলাম: বর্তমানে আমাদের দেশে মাদরাসাগুলোর যে অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা দেখা যাচ্ছে, তা অনেকাংশেই আমাদের আকাবিরদের চেতনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। একসময় যেভাবে দেওবন্দের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো দায়িত্বশীল ও সম্মানজনকভাবে এই ব্যবস্থা পরিচালনা করত, আজকের বাস্তবতায় তা অনেক ক্ষেত্রেই লঙ্ঘিত হচ্ছে।

বিশেষত কোরবানির সময় বা রমজানে ছাত্র ও শিক্ষকদের দিয়ে বাড়ি-বাড়ি ঘুরে সাহায্য সংগ্রহ করার দৃশ্য আমাদের বিবেককে নাড়া দেয়, আমাদের অন্তরকে পীড়িত করে। একই বাড়ির সামনে যখন ছাত্র ও শিক্ষক চামড়ার জন্য দাঁড়িয়ে থাকেন এবং পাশাপাশি একজন ভিক্ষুক গোশতের জন্য অপেক্ষা করে, তখন বাড়ির মালিক তাদের সবার প্রতিই বিরক্তি প্রকাশ করে, এমনকি কখনো অপমান করে ধাক্কা দিয়ে বের করে দেয়। এ রকম অনেক লাঞ্ছনাকর ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী আমরা নিজেরাই।

অল্প সময়ে বেশি অর্থ আসার কারণে মাদরাসা কমিটির অনেকে এসব কার্যক্রম বন্ধ করতে চান না। কিন্তু এর ফলে যে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকসমাজের সম্মানহানি হয়, তা যেন কেউই বিবেচনায় রাখে না। শুধু চামড়ার কালেকশনই নয়, রমজানে যাকাত সংগ্রহের জন্য শিক্ষকদের বাধ্য করাও এখন অনেক মাদরাসার স্বাভাবিক চিত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে।

হযরত থানবী (রহ.) স্পষ্টভাবে বলেছেন—শুধু ছাত্রই নয়, শিক্ষকও কালেকশনের জন্য যাবে না। এমনকি এই সিদ্ধান্তের কারণে মাদরাসার সংখ্যা কমে গেলেও তাতে দ্বীনের কোনো ক্ষতি নেই, বরং সেটাই কল্যাণকর।

আমরা আমাদের প্রতিষ্ঠানে এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছি, যাতে ছাত্র-শিক্ষকদের ইজ্জত সুরক্ষিত থাকে। তারা চামড়া বা যাকাত সংগ্রহের জন্য মানুষের দরজায় যাবে না। সম্মানের সঙ্গে যার যার সাধ্যানুযায়ী দান করতে পারলে করবে, না পারলে কেউ বাধ্য করবে না। অর্থনৈতিক দিক বিবেচনায় আমরা সালাফে সালেহীনের পথ অনুসরণ করে এমন একটি চেতনার দিকে ফিরছি, যেখানে ইলম অর্জনের খরচ শিক্ষার্থী নিজেই বহন করত।

আমাদের প্রতিষ্ঠানেও তাই ঠিক করেছি—ভর্তির সময় মেধা বিবেচনায় আসবে, কিন্তু মাসিক খরচ মওকুফ হবে আর্থিক সামর্থ্য অনুযায়ী, নম্বর অনুযায়ী নয়। ধনী-গরিব সবাই সমান সুযোগ পাবে। তবে প্রত্যেকে নিজের সাধ্যানুযায়ী খরচ বহন করবে। কেউ একেবারে কিছুই দেবে না—এমনটি যেন না হয়। যে যতটুকু পারে, তা-ই দেবে, বাকি দায়িত্ব প্রতিষ্ঠান নেবে।

এইভাবে শিক্ষার্থীদের মধ্যে আত্মমর্যাদা ও দানের অভ্যাস তৈরি হবে, যা শুধু ইলম অর্জনের জন্য নয়, তার ব্যক্তিত্ব গঠনের জন্যও অপরিহার্য। কারণ কেবল গ্রহণ করেই কেউ বড় হতে পারে না। যদি কাউকে দানের অভ্যাস শেখানো না হয়, সে কখনো প্রকৃত ব্যক্তিত্ববান মানুষ হয়ে উঠতে পারে না। তার প্রতি মানুষের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা গড়ে ওঠে না। সে সমাজে প্রভাব ফেলতে পারে না, বরং গলে যায় অর্থবিত্তের সামনে।

তাই কেবল মেধা নয়, সেই মেধার সম্মানজনক ব্যবহারের জন্য প্রয়োজন আত্মমর্যাদা ও ব্যক্তিত্ববোধ। আমাদের লক্ষ্য—এমন আলেম তৈরি করা, যারা সম্মান নিয়ে জীবনযাপন করবে, দীনের খেদমত করবে, আর সমাজে মাথা উঁচু করে চলবে।


an adbox will go here