সাংস্কৃতিক আগ্রাসন: বাস্তবতা ও করণীয়
ম. কিবরিয়া চৌধুরী হেলিম. সাংস্কৃতিক আগ্রাসন আমাদের জাতীয় পরিচিতি ও মূল্যবোধের ওপর গভীর প্রভাব ফেলছে। এটি একটি শক্তিশালী সংস্কৃতির প্রভাবের মাধ্যমে অন্য সংস্কৃতিকে ধ্বংস করে পরনির্ভরশীল করে তোলে। বাংলাদেশে এই প্রক্রিয়া ঔপনিবেশিক শাসনকাল থেকে বিশ্বায়নের যুগ পর্যন্ত বিদ্যমান।
সংস্কৃতির একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য হলো এর প্রবাহমানতা। দুর্বল বা শূন্যতাযুক্ত সংস্কৃতি সহজেই অন্য সংস্কৃতির দ্বারা প্রভাবিত হয়। দীর্ঘ ঔপনিবেশিক শাসন, দারিদ্র্য ও লক্ষ্যহীন রাজনীতি আমাদের সাংস্কৃতিক শূন্যতার পেছনে দায়ী। বর্তমানে কেবল টিভি, ভিডিও স্ট্রিমিং এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের মাধ্যমে বাইরের সংস্কৃতির ব্যাপক প্রভাব দেখা যাচ্ছে। বিশেষত, বোম্বে ছবি, পশ্চিমা টিভি অনুষ্ঠান ও পপ মিউজিক আমাদের জীবনযাপন ও মানসিকতায় পরিবর্তন আনছে।
সংস্কৃতির বহিরঙ্গ, যেমন পোশাক, চলচ্চিত্র ও টিভি অনুষ্ঠান, দ্রুত পরিবর্তিত হয়। তবে অন্তরঙ্গ দিক, যেমন মূল্যবোধ ও চিন্তাভাবনা, ধীরে পরিবর্তিত হয় এবং দীর্ঘমেয়াদে চেতনায় প্রভাব ফেলে। বহিরঙ্গ দুর্বল হওয়ায় বাইরের সংস্কৃতি সহজে প্রবেশ করছে। তবে রক্ষণশীল মানসিকতা একে গ্রহণে দ্বিধার সৃষ্টি করে, যা সাংস্কৃতিক সংঘাত বাড়ায়।
এই সংকট থেকে মুক্তি পেতে আমাদের নিজেদের সাংস্কৃতিক ভিতকে শক্তিশালী করতে হবে। দারিদ্র্য, অশিক্ষা ও গণতন্ত্রহীনতা দূরীকরণ ছাড়া এটি সম্ভব নয়। দারিদ্র্য দূর হলে নিম্নমানের সংস্কৃতির প্রতি আকর্ষণ কমবে। মানসম্মত শিক্ষা সৃজনশীলতা ও বিচারবুদ্ধি বাড়াবে। গণতান্ত্রিক পরিবেশ মুক্ত চিন্তার বিকাশ ঘটাবে।
এছাড়া নিজস্ব বিনোদন মাধ্যমের মানোন্নয়ন করতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সৃজনশীল কার্যক্রম বাড়ানো এবং তরুণ প্রজন্মকে ঐতিহ্যের সঙ্গে সংযুক্ত করতে হবে।
সাংস্কৃতিক আত্মবিশ্বাস গড়ে তোলা জরুরি। রাজনৈতিক বিতর্ক দিয়ে সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়। নিজের সংস্কৃতির পুনরুদ্ধার ও প্রসারের মাধ্যমে আত্মমর্যাদা ও আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনতে হবে। এই আত্মবিশ্বাসই জাতির সাংস্কৃতিক শূন্যতা দূর করবে এবং উন্নত জাতি হিসেবে বিশ্বে প্রতিষ্ঠিত হতে সাহায্য করবে।
লিখক. সাংবাদিক, প্রাবন্ধিক, [সদস্য সচিব. নেত্রকোনা জেলা প্রেসক্লাব]