নারী সিরিয়াল কিলার: অপরাধ মনস্তত্ত্ব ও সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি - দিগন্ত জার্নাল

নারী সিরিয়াল কিলার: অপরাধ মনস্তত্ত্ব ও সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি

উপসম্পাদকীয়:

সিরিয়াল কিলিং নিয়ে গবেষণা করতে গেলে সাধারণত পুরুষ অপরাধীদের কথাই আগে উঠে আসে। কিন্তু নারীরাও যে সিরিয়াল কিলিংয়ে যুক্ত থাকে, সেটি তুলনামূলকভাবে কম আলোচিত। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটি গবেষণা অনুযায়ী, প্রতি ছয়জন সিরিয়াল কিলারের মধ্যে একজন নারী। বিষয়টি সাধারণ মানুষের কল্পনার বাইরে থাকলেও, মনোবিজ্ঞানীরা মনে করেন, এটি সমাজের গঠনতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গির ফল।

এই তথ্যটি দিয়েছেন ডা. মারিশা হ্যারিসন, যিনি দীর্ঘ দশ বছর ধরে সিরিয়াল কিলিং নিয়ে গবেষণা করেছেন। তার গবেষণাপত্রে প্রায় বারোশোর বেশি রেফারেন্স রয়েছে, কিন্তু এরপরও তিনি ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েছেন। কারণ প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, নারীরা এতটা নিষ্ঠুর ও হিংস্র হতে পারে না।

নারী সিরিয়াল কিলারদের মনস্তত্ত্ব বোঝার জন্য গবেষকরা দেখেছেন, ৪৯% সিরিয়াল কিলার শৈশবে শারীরিক বা মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছে, যার মধ্যে নারী অপরাধীদের ক্ষেত্রে সংখ্যাটি ৪৪%। এই নারী অপরাধীদের একটি বড় অংশই পেশায় নার্স, যারা ধীরে ধীরে বিষ প্রয়োগ বা অন্যান্য উপায়ে হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে থাকে।

ডা. মারিশার গবেষণা অনুযায়ী, শৈশবের ট্রমা নার্ভাস সিস্টেমে স্থায়ী পরিবর্তন আনে, যার ফলে অনেকেই রিয়েক্টিভ হয়ে ওঠে, সহজে রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না এবং প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে ওঠে। যদিও প্রত্যেক নির্যাতিত শিশু বড় হয়ে অপরাধী হয় না, তবে অনেক সিরিয়াল কিলারই শৈশবে নির্যাতনের শিকার ছিল, যা তাদের অপরাধপ্রবণতাকে উসকে দিয়েছে।

রাজনীতির সঙ্গে অপরাধ মনস্তত্ত্বের যোগসূত্র

সিরিয়াল কিলিং বা অপরাধ প্রবণতা সাধারণত ব্যক্তিগত মানসিক গঠন ও পারিপার্শ্বিক অবস্থার ওপর নির্ভর করে। রাজনৈতিকভাবে ক্ষমতাধর ব্যক্তিরাও অনেক সময় অপরাধপ্রবণ আচরণ প্রদর্শন করতে পারেন, বিশেষ করে যখন তারা শৈশবে কোনো নির্যাতনের শিকার হন বা ব্যক্তিজীবনে প্রবল প্রতিকূলতার সম্মুখীন হন।

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসেও কিছু ব্যক্তির মধ্যে এই প্রবণতা দেখা যায়। কথিত আছে, একজন প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেত্রীকে তার স্বামী প্রহার করতেন এবং তার পরিবার তাকে আবারও সেই সম্পর্কে ফিরিয়ে দিত। যদি এটি সত্য হয়, তবে এটি তার মানসিক গঠনের ওপর গভীর প্রভাব ফেলতে পারে এবং ভবিষ্যতে প্রতিশোধপরায়ণ মানসিকতা তৈরি করতে পারে। মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, দীর্ঘদিন অবদমিত ক্ষোভ ও নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিরা অনেক সময় কঠোর প্রতিশোধমূলক আচরণে লিপ্ত হয়।

তবে শৈশবে নির্যাতিত হওয়া বা ব্যক্তিগত জীবনে কঠিন সময় পার করা কোনো অপরাধের পক্ষে যৌক্তিকতা তৈরি করে না। যেমন ধর্ষকদের ক্ষেত্রে দেখা যায়, তাদের একটি বড় অংশ শৈশবে নির্যাতনের শিকার হয়েছে, কিন্তু সেটি তাদের অপরাধকে বৈধতা দেয় না।

সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের প্রয়োজন

সিরিয়াল কিলিং বা অপরাধ প্রবণতার ক্ষেত্রে আমরা সাধারণত পুরুষদেরকেই মূল অপরাধী হিসেবে দেখি, কিন্তু বাস্তবে নারীরাও কম নন। সমাজে প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী, নারীরা কোমল ও যত্নশীল হবে—এই বিশ্বাসের কারণে তাদের অপরাধমূলক আচরণ সহজে নজরে আসে না। ডা. মারিশার মতে, সমাজ যদি নারীদের সন্দেহ করত, তাহলে ধরা পড়া নারী সিরিয়াল কিলারের সংখ্যা আরও বেশি হতো।

নারী হোক বা পুরুষ, অপরাধী সবসময়ই অপরাধী। অপরাধের কারণ বিশ্লেষণ করা যেতে পারে, কিন্তু সেটিকে ন্যায়সঙ্গত করার সুযোগ নেই। রাজনীতি হোক বা সমাজ, আমাদের উচিত অপরাধীদের মানসিক গঠন ও অপরাধ প্রবণতা বিশ্লেষণ করা এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা, যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের প্রবণতা কমে আসে।

উপসংহার

সিরিয়াল কিলিং, নারী অপরাধ প্রবণতা এবং রাজনীতির মনস্তত্ত্ব—এসব বিষয় গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে বোঝা যায়, অপরাধীরা সাধারণত শৈশবের অভিজ্ঞতা বা পারিপার্শ্বিকতার কারণে একটি নির্দিষ্ট মানসিক গঠনে পৌঁছায়। সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন এবং অপরাধীদের প্রোফাইলিংয়ের মাধ্যমে ভবিষ্যতে এই প্রবণতা রোধ করা সম্ভব। নারী বা পুরুষ—অপরাধীর পরিচয় একটাই, সে অপরাধী। তাদের বিচার হওয়া উচিত সমানভাবে, কোনো প্রকার পক্ষপাত ছাড়াই।

আয়েশা ফারহীন: লিখক ও গবেষক, অধ্যায়নরত, কবি নজরুল বিশ্ববিদ্যালয় ত্রিশাল, ময়মনসিংহ।

an adbox will go here