শোষণের ইতিহাস: ব্রিটিশ থেকে পাকিস্তান, পাকিস্তান থেকে স্বাধীন বাংলাদেশ
✍ উপসম্পাদকীয় | দিগন্ত জার্নাল
বাংলাদেশের ইতিহাস এক দীর্ঘ শোষণ ও বঞ্চনার অধ্যায়। নবাব সিরাজউদ্দৌলার পতনের পর ২০০ বছর ধরে ব্রিটিশরা এদেশের সম্পদ লুট করেছে, আর সেই লুটের অংশীদার ছিল কলকাতা-কেন্দ্রিক কিছু স্বার্থান্বেষী মহল। বাংলাকে দারিদ্র্যের অতল গহ্বরে ঠেলে দেওয়া হয়েছিল, যার ফলে কয়েক দফা ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ হয়েছিল। ১৭৭০, ১৭৮৩, ১৮৬৬, ১৮৭৩-৭৪ সালের দুর্ভিক্ষে লক্ষ লক্ষ মানুষ অনাহারে মৃত্যুবরণ করেছে। ব্রিটিশ শাসনের ভয়াবহতা সম্পর্কে উইলিয়াম হান্টারের ‘পল্লী বাংলার ইতিহাস’ বইতে উল্লেখ আছে, তখন মানুষের দারিদ্র্য এতটাই চরমে পৌঁছেছিল যে কেউ কেউ মৃত মানুষের মাংস খেতে বাধ্য হয়েছিল! ব্রিটিশদের শোষণে বাংলা নিঃস্ব হয়ে গিয়েছিল, অথচ সেই সম্পদ দিয়ে লন্ডন, কলকাতা, দিল্লি সমৃদ্ধ হয়েছে।
১৯৪৭ সালে ভারত-পাকিস্তান বিভক্তির পর বাঙালিরা ভেবেছিল, অবশেষে মুক্তি মিলবে। কিন্তু পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী পূর্ববাংলার সম্পদ লুটপাটের নতুন অধ্যায় শুরু করল। পূর্ব পাকিস্তান থেকে মোট রাজস্ব আয়ের ৬০% আদায় করা হলেও উন্নয়নের জন্য মাত্র ২৫% খরচ করা হতো। শিল্পায়ন, অবকাঠামো উন্নয়ন, প্রশাসনে অংশগ্রহণ—সবকিছুতেই ছিল চরম বৈষম্য। বাংলার মানুষ পাকিস্তানের অর্থনীতিকে বাঁচিয়ে রেখেছিল, অথচ এখানে শিল্প গড়ে ওঠেনি, চাকরিতে বাঙালিদের জন্য ছিল সীমিত সুযোগ।
১৯৭১ সালে বাঙালিরা অধিকার আদায়ের জন্য রুখে দাঁড়ালে পাকিস্তান সেনারা নির্মম হত্যাযজ্ঞ চালায়। ৩০ লাখ নিরীহ মানুষকে হত্যা করা হয়, ২ লাখ মা-বোনকে নির্যাতন করা হয়, শত শত গ্রাম জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। আমাদের দেশের মানুষের উপর চালানো এই নিপীড়নের জন্য পাকিস্তানের এখনো ৫ লাখ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কথা, কিন্তু সেই দাবি আদায়ের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
স্বাধীনতার পর আমরা ভেবেছিলাম, শোষণের যুগ শেষ হবে। কিন্তু বাস্তবে স্বাধীন বাংলাদেশেও একটি দুর্নীতিবাজ ও লুটেরা গোষ্ঠী গড়ে উঠেছে। দেশের ৯০% সম্পদ মাত্র ১০% মানুষের হাতে বন্দী। কিছু ব্যবসায়ী, আমলা ও রাজনৈতিক দুর্বৃত্ত দেশের মানুষের সম্পদ লুট করে বিদেশে পাচার করছে। সাধারণ মানুষ এখনো দারিদ্র্য ও বৈষম্যের শিকার।
শুধু তাই নয়, পাকিস্তানে আটকে থাকা লাখো বাংলাদেশি এখনো মানবেতর জীবনযাপন করছে। পাকিস্তান সরকার তাদের নাগরিকত্ব দেয়নি, ফলে তারা শিক্ষা, চাকরি বা চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত। রোহিঙ্গাদের থেকেও খারাপ অবস্থায় তারা বস্তিতে দিন কাটাচ্ছে। অথচ তাদের জন্য বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
বাংলাদেশের জনগণ বারবার শোষিত হয়েছে, বারবার প্রতারিত হয়েছে। ব্রিটিশদের হাতে, পাকিস্তানিদের হাতে, এমনকি স্বাধীন বাংলাদেশেও কিছু স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর হাতে। পাকিস্তানের জনগণের প্রতি আমাদের কোনো ক্ষোভ নেই, কারণ তারাও নিজেদের শাসকদের দ্বারা শোষিত। কিন্তু শাসকগোষ্ঠী আমাদের সঙ্গে যে প্রতারণা করেছে, তার বিচার ও ক্ষতিপূরণ চাইতে হবে। একইসঙ্গে, দেশের ভেতরের লুটেরাদের বিরুদ্ধেও রুখে দাঁড়াতে হবে। লুটপাট বন্ধ না হলে, সম্পদের সুষম বণ্টন নিশ্চিত না হলে, বাংলাদেশ সত্যিকারের মুক্তি পাবে না।
আয়েশা ফারহীন : লিখক ও গবেষক, অধ্যায়নরত, কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়।
দিগন্ত জার্নাল | সাম্যের আহ্বানে