জুলাই বিপ্লবের শহীদ: নাফিসার আত্মত্যাগের ইতিহাস - দিগন্ত জার্নাল

জুলাই বিপ্লবের শহীদ: নাফিসার আত্মত্যাগের ইতিহাস

নিজস্ব প্রতিবেদক । দিগন্ত জার্নাল

বাংলাদেশের ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লব ছিল এক অভূতপূর্ব ছাত্র-জনতার আন্দোলন, যেখানে হাজারো তরুণ-তরুণী রাজপথে নেমেছিল সমতার দাবিতে। কোটা সংস্কারের আন্দোলন থেকে শুরু হয়ে এই বিপ্লব পরিণত হয় গণতন্ত্র ও ন্যায়বিচারের জন্য এক মহাযুদ্ধে। সেই আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া, লড়াই করা, এবং সর্বোচ্চ আত্মত্যাগের নজির স্থাপন করা সাহসী নারীদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন নাফিসা হোসেন মারওয়া।

নাফিসা ছিলেন টঙ্গীর এক চা দোকানির মেয়ে। তার মা কুয়েতপ্রবাসী গৃহকর্মী। আর্থিক অনটন ছিল নিত্যসঙ্গী, কিন্তু তবু স্বপ্ন দেখতেন বড় হওয়ার, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর। পরিবারের শত বাধা উপেক্ষা করেও তিনি আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন, রাজপথে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। তবে রাজপথ থেকে আর ঘরে ফেরা হয়নি তার— একটি স্বৈরাচারী শাসনের বুলেট তার জীবন কেড়ে নিয়েছে, কিন্তু তার আত্মত্যাগ রয়ে গেছে ইতিহাসের পাতায়।


শিক্ষা, সংগ্রাম, এবং রাজপথে নেতৃত্ব

নাফিসা সাভার ল্যাবরেটরি কলেজের ইন্টার প্রথম বর্ষের ছাত্রী ছিলেন। পরে টঙ্গীর সাহাজউদ্দিন সরকার আদর্শ উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়ে মাইগ্রেশন করেন এবং বাবার সঙ্গে থেকে পড়াশোনা চালিয়ে যান। চা দোকানদার বাবার সীমিত উপার্জন ও মায়ের পাঠানো অর্থে চলত তাদের সংসার। ছোটবোন ছিল সাভারে নানুর বাসায়।

কোটা সংস্কার আন্দোলন যখন সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে, তখন নাফিসা ও তার বন্ধুরা মিলে মেসেঞ্জারে একটি গ্রুপ তৈরি করেন, যেখানে প্রতিদিন আন্দোলনের কৌশল নির্ধারণ হতো। এরপর রাজপথে সরব উপস্থিতি, সাহসী নেতৃত্ব এবং শাসকগোষ্ঠীর রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে সামনে থেকে আন্দোলন চালিয়ে যান তিনি।

প্রথমদিকে তার বাবা কিছুই জানতেন না। পরে প্রতিবেশীদের মাধ্যমে জানতে পেরে তাকে আন্দোলনে যেতে নিষেধ করেন, বকাঝকা করেন। কিন্তু তিনি পিছিয়ে যাননি।


পরিবারের বাধা এড়িয়ে আন্দোলনে অবিচল

২৮ জুলাই, নাফিসা তার বাবাকে বলেন— “সাভারে মামার বাসায় যাব, কারণ এখন আর পরীক্ষা হওয়ার সম্ভাবনা নেই।”
বাবা ভাবলেন, মেয়েকে টঙ্গীতে আটকে রাখা যাবে না, তাই মামার বাড়িতে পাঠালে হয়তো মামারা তাকে দেখাশোনা করবেন।

কিন্তু নাফিসা সেখানেও থেমে থাকেননি। ৩০ জুলাই ছোট মামার বাসায় গিয়েও নিয়মিত আন্দোলনে অংশ নিতেন। মামারা নিষেধ করতেন, কিন্তু তিনি শুনতেন না।

৩ আগস্ট বিকেলে আন্দোলনে থাকা অবস্থায় বাবাকে একটি সেলফি পাঠান। বাবা ছবি দেখে ক্ষুব্ধ হয়ে কল দেন—
“তুই রাস্তায় গেলি কেন?”
নাফিসা উত্তর দেন না।


৫ আগস্ট: রাজপথে শেষ যাত্রা

৫ আগস্ট সকালে তিনি আবার বের হওয়ার প্রস্তুতি নেন। মামারা বাধা দেন, কিন্তু তিনি কোনোভাবে তাদের চোখ ফাঁকি দিয়ে বেরিয়ে যান।

দুপুর আড়াইটার দিকে বাবাকে কল দিয়ে বলেন— “আব্বু, হাসিনা পলাইছে।”
বাবা বিরক্ত হয়ে বলেন— “হাসিনা পলাইছে, তোর বাপের কী? তোর কিছু হলে কে দেখবে?”
নাফিসার উত্তর ছিল— “আর পেছনে ফিরে যাওয়ার সময় নাই, আব্বু। আল্লাহ যা কপালে রাখছে, তা হবে।”

এর কয়েক মিনিট পরই সাভার মডেল মসজিদের সামনে ছাত্র-জনতার মিছিলের ওপর পুলিশ, ছাত্রলীগ ও যুবলীগের যৌথ হামলা হয়।

পুলিশ আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে এলোপাতাড়ি গুলি চালায়। প্রথম সারিতে থাকার কারণে গুলিবিদ্ধ হন নাফিসা। তাকে দ্রুত ল্যাবজোন হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।


বাবার দৌড়, কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি

বাবা তখনও জানতেন না, কি ভয়ংকর পরিণতি অপেক্ষা করছে।

খবর পেয়ে তিনি দোকান বন্ধ করে সাভারের উদ্দেশ্যে রওনা হন। পথে মামাদের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেন, কিন্তু ফোন বন্ধ পান। স্ত্রীকে (নাফিসার মা) কুয়েতে কল দেন, যাতে তিনি মামাদের জানাতে পারেন।

অন্যদিকে মামারাও খবর পেয়ে দ্রুত হাসপাতালে ছুটে যান। কিন্তু তারা পৌঁছানোর আগেই নাফিসা অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন।

তাকে এনাম মেডিকেলে নেওয়া হলেও চিকিৎসকরা তাকে বাঁচাতে পারেননি।


লাশ ফেরানোর লড়াই

মামারা নাফিসার মরদেহ নিয়ে ফেরার সময় সাভারের মুক্তির মোড়ে ছাত্রলীগ-যুবলীগের আরেক দফা হামলার শিকার হন। পুলিশের ছররা গুলিতে আহত হন তার মামা।

অবশেষে এলাকাবাসীর সহায়তায় একটি অ্যাম্বুলেন্সে করে বিকাল সাড়ে চারটার দিকে নাফিসার লাশ মামার বাসায় পৌঁছায়। তখনও তার বাবা এসে পৌঁছাতে পারেননি।

রাত ৯টায় সাভারে প্রথম জানাজা শেষে টঙ্গীর এরশাদনগরে পৈতৃক ভিটায় নেওয়া হয়। কোনো অ্যাম্বুলেন্স পাওয়া যাচ্ছিল না। শেষ পর্যন্ত চার গুণ বেশি ভাড়া দিয়ে পিকআপ ভাড়া করে মেয়ের লাশ নিয়ে যান তার বাবা।

টঙ্গীতে দ্বিতীয় জানাজা শেষে এলাকার কবরস্থানে দাফন করা হয় শহীদ নাফিসাকে।


নাফিসার ফলাফল, কিন্তু সে আর জানলো না

নাফিসার এইচএসসির ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে, সে পেয়েছে জিপিএ ৪.২৫।
কিন্তু সে আর নিজের রেজাল্টটা জানতে পারলো না।

তার বাবা মোবাইলের ওপাশ থেকে কান্নাভেজা কণ্ঠে বলেন—
“আমি দোকানে বসি, কিন্তু আমার মন পড়ে থাকে মেয়ের কথায়। মেয়ে পাশ করে আমার কষ্ট আরও বাড়িয়ে দিয়েছে, কারণ সে নিজে তার রেজাল্টটা জানতে পারলো না। মেয়ের সাথে আমার শেষ কথা ছিল— ‘আব্বু, আমি তো বাঁচব না, লাশটা নিয়ে যাইয়ো।’”


শহীদ নাফিসার আত্মত্যাগ কি স্মরণীয় থাকবে?

নাফিসা এই দেশের হাজারো সংগ্রামী তরুণের প্রতীক, যে স্বৈরাচার ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়েছিল, লাশ হয়ে ফিরেছিল।

জুলাই বিপ্লবে এমন হাজারো নাফিসা ছিল, যারা ঘরে বাবা-মায়ের সাথে যুদ্ধ করে রাস্তায় নেমেছিল, আবার রাস্তায় নেমে পুলিশ ও ছাত্রলীগ-যুবলীগের হামলার শিকার হয়েছিল।

আমরা কি এই বীর শহীদদের ভুলে যাব? নাকি তাদের রক্তের ঋণ শোধ করব?

শহীদ নাফিসা, তোমাকে আমরা ভুলব না। তোমার রক্তের বিনিময়ে যে ইতিহাস লেখা হয়েছে, তা কখনও মুছে যাবে না।

[দিগন্ত জার্নাল । সাম্যের আহ্বানে]

an adbox will go here