স্থাপত্যশৈলীর অপূর্ব নিদর্শন বরিশালের গুঠিয়া মসজিদ
দিগন্ত জার্নাল ডেস্ক:
মোগল ও আধুনিক স্থাপত্যশিল্পের মিশেলে নির্মিত ‘বায়তুল আমান জামে মসজিদ’ বরিশালের অন্যতম দর্শনীয় স্থান হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। তবে স্থানীয়দের কাছে এটি গুঠিয়া বা সান্টুর মসজিদ নামেই বেশি পরিচিত। মাত্র ১৮ বছর আগে নির্মিত এই মসজিদ এখন প্রতিদিনই শত শত দর্শনার্থীর পদচারণায় মুখর থাকে। শুধুমাত্র ইসলাম ধর্মাবলম্বীরাই নন, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টানসহ অন্যান্য ধর্মের মানুষও এই স্থাপত্যের অপূর্ব সৌন্দর্য উপভোগ করতে আসেন।
অবস্থান ও নির্মাণ ইতিহাস
বরিশাল নগরী থেকে ২১ কিলোমিটার দূরে উজিরপুর উপজেলার গুঠিয়া ইউনিয়নের চাংগুরিয়া গ্রামে বরিশাল-বানারীপাড়া সড়কের পাশে মসজিদটি অবস্থিত। এটি স্থানীয় শিল্পপতি সরদার সরফুদ্দিন সান্টুর উদ্যোগে ২০০৩ সালের ১৩ ডিসেম্বর নির্মাণ শুরু হয় এবং ২০০৬ সালে সম্পন্ন হয়। প্রায় ২০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই মসজিদের সৌন্দর্যবর্ধনে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে মূল্যবান সামগ্রী সংগ্রহ করা হয়। সৌদি আরবের মক্কা-মদিনা থেকে আনা হয়েছে মসজিদের টাইলস, ঝাড়বাতি ও আলোকসজ্জার সামগ্রী।
অপূর্ব নির্মাণশৈলী ও স্থাপত্য বৈশিষ্ট্য
বরিশাল নগরী থেকে মাত্র ২৫-৩০ মিনিটের দূরত্বে এই মসজিদে প্রবেশের পরেই চোখে পড়ে সুউচ্চ তোরণ, দৃষ্টিনন্দন পুকুর ও চারপাশে ফল-ফুলের বাগান। বিশাল পুকুরে রাজহাঁসের ঝাঁক যেন পরিবেশকে আরও মনোমুগ্ধকর করে তুলেছে। টাইলসের ঝকঝকে সড়ক ধরে সামনে এগোলেই দেখা মেলে অনিন্দ্য সুন্দর বায়তুল আমান মসজিদের।
মসজিদের মূল মিনার ১৯৩ ফুট উচ্চতার, যা দক্ষিণ এশিয়ার তৃতীয় সর্বোচ্চ মিনার হিসেবে পরিচিত। মসজিদের মূল কাঠামোতে ৯টি মিনার রয়েছে, যার মধ্যে ৮টি মিনারে ঝাড়বাতি যুক্ত। আরবি হরফের সুদৃশ্য ক্যালিগ্রাফি পুরো মসজিদ জুড়ে খচিত রয়েছে। সামনেই রয়েছে দুটি দৃষ্টিনন্দন ফোয়ারা। রাতের বেলা রঙিন আলোকসজ্জার কারণে মসজিদ ও আশপাশের এলাকা হয়ে ওঠে এক অপার্থিব সৌন্দর্যের প্রতিচ্ছবি।
ইসলামিক শিক্ষা ও ধর্মীয় কার্যক্রম
মসজিদের ইমাম হাফেজ মো. সিদ্দিকুর রহমান জানান, মসজিদের সঙ্গে একটি মাদ্রাসা ও এতিমখানা রয়েছে। মসজিদের মূল ভবনে একসঙ্গে ২ হাজার মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারেন, আর ঈদগাহ মাঠসহ মোট ২০ হাজার মানুষ নামাজ পড়তে পারেন। মসজিদের পাশে রয়েছে মেহমানখানা। মসজিদের কর্মচারীদের বেতনসহ সমস্ত ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠাতা সরদার সরফুদ্দিন সান্টু নিজেই দেখাশোনা করেন।
পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে জনপ্রিয়তা
প্রতিদিনই দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে অসংখ্য দর্শনার্থী মসজিদটি দেখতে আসেন। যশোরের মনিরামপুরের বাসিন্দা আল আমিন তালুকদার বলেন, “শুনেছিলাম, বরিশালে দৃষ্টিনন্দন একটি মসজিদ আছে। এবার সরাসরি এসে দেখে মুগ্ধ হয়েছি।”
বরগুনার আয়লা-পাতাকাটা থেকে আসা সুশীল মিস্ত্রি জানান, “পরিবার নিয়ে এসেছি মসজিদটি দেখতে। এত সুন্দর মসজিদ বরিশালে আছে, তা না দেখলে বিশ্বাস হতো না।”
পর্যটন সুবিধার অভাব
মসজিদের সামনে থাকা দোকানি ওমর মুন্সি বলেন, প্রতিদিন দেশের নানা প্রান্ত থেকে অসংখ্য মানুষ আসেন, তবে তাদের থাকার জন্য কোনো আবাসিক হোটেলের ব্যবস্থা নেই। পর্যটকদের সুবিধার্থে একটি আবাসিক হোটেল বা থাকার সুব্যবস্থা করা হলে দূর-দূরান্ত থেকে আসা দর্শনার্থীদের কষ্ট অনেকটাই লাঘব হতো।
অপূর্ব স্থাপত্যশৈলী, দৃষ্টিনন্দন পরিবেশ ও ইসলামিক শিক্ষার কেন্দ্র হিসেবে গুঠিয়া মসজিদ এখন শুধুমাত্র নামাজ আদায়ের স্থান নয়, বরং এক অনন্য পর্যটন কেন্দ্রেও পরিণত হয়েছে।