দিল্লিদাসি হাসিনার পতনের পর আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত - দিগন্ত জার্নাল

দিল্লিদাসি হাসিনার পতনের পর আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত

সম্পাদকীয় কলাম ।  দিগন্ত জার্নাল

২৪ সালের জুলাই আগস্টে( জুলাই বিপ্লবে)  ছাত্র-জনতার রক্তক্ষয়ী আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে গত বছরের ৫ আগস্ট দেশ ছেড়ে ভারতে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন ফ্যাসিস্ট সরকারপ্রধান “দিল্লিদাসি” খ্যাত শেখ হাসিনা। টানা ১৫ বছর ফ্যাসিবাদী কায়দায় লুটতরাজ, খুন,গুম,জুলুম নির্যাতনের মাধ্যমে ক্ষমতায় থাকা ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ জুলাই বিপ্লবের ফলে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে রাজনীতির কেন্দ্র থেকে। বর্তমানে দলটির শীর্ষ নেতৃত্বসহ কেন্দ্রীয়, জেলা, উপজেলা এমনকি তৃণমূলের নেতারাও পালিয়ে, আত্মগোপনে বা কারাগারে রয়েছেন। এই অবস্থার ফলে হাসিনা সরকারের পতনের সাত মাস পরেও আওয়ামী লীগ রাজনৈতিকভাবে কোনো শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করতে ব্যর্থ হয়েছে, বাংলাদেশের জনগন তাদের পরিপূর্ণ ভাবে বয়কট করেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, আওয়ামী লীগ দীর্ঘদিন ধরে রাজনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিলো। দুঃশাসন, দুর্নীতি ও কর্তৃত্ববাদী মনোভাবের কারণে জনগণের আস্থা হারিয়ে ফেলে দলটি। প্রশাসন ও গোয়েন্দা সংস্থার ওপর নির্ভর করে টানা তিনটি বিতর্কিত নির্বাচন, প্রথমত ভোট কারচুপির মাধ্যমে ২০০৮ এর ডিসেম্বর ক্ষমতায় দক্ষল করে। তারপর দিনের ভোট রাতে করে জোরপূর্বক আবার ক্ষমতায় আসে,অথপর পুলিশ প্রশাসন ম্যানেজার মাধ্যমে পরপর দুইবার বিনা ভোটেই ক্ষমতা দক্ষল করে রাষ্ট্র পরিচালনার নামে স্মরণকালের শ্রেষ্ঠ নির্যাতনের লুটতরাজের সেরা দল হিসেবে ক্ষমতায় থাকলেও গণঅভ্যুত্থান ঠেকাতে ব্যর্থ হয় দলটি। নানা সংকটকে রাজনৈতিকভাবে সমাধান না করে বলপ্রয়োগের মাধ্যমে দমনের পথ বেছে নেয় তারা, যার ফলে জনগণের ক্ষোভ চরমে পৌঁছায় এবং শেষ পর্যন্ত আওয়ামী লীগ স্মরণকালের শ্রেষ্ঠ  পতনের মুখে পড়ে।

নেতৃত্বহীন আওয়ামী লীগ ও ভবিষ্যৎ সংকট

আওয়ামী লীগের পতনের পর দলটির ভবিষ্যৎ নিয়ে রাজনৈতিক মহলে নানা আলোচনা চলছে। দলটির বেশিরভাগ সিনিয়র নেতা পালি ভারতের আশ্রয়ে। বাকী নেতাকর্মীরা এখনো আত্মগোপনে থাকায় নতুন নেতৃত্ব গঠনের কোনো উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। ১৯৭৫ সালে শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ডের পরও আওয়ামী লীগের নেতারা সংগঠিত হতে পেরেছিলেন, কিন্তু এবার দৃশ্যত কেউ নেতৃত্ব দেওয়ার মতো অবস্থানে নেই। দেশের ভেতরে থাকা নেতারা মানসিকভাবে দুর্বল এবং নৈতিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ। অর্থপাচার, দুর্নীতি ও লুটপাট, খুন গুম আর দুঃশাসনের অভিযোগ তাদের বিরুদ্ধে উঠেছে, যার ফলে তারা জনগণের সামনে নিজেদের গ্রহণযোগ্য করে তুলতে পারছেন না।

একই সঙ্গে দলটিকে নিষিদ্ধ করা হবে কি না, এ নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। তবে একটি ব্যাপারে ঐকমত্য রয়েছে যে, আওয়ামী লীগকে শিগগিরই রাজনীতির মূলধারায় ফিরে আসতে দেওয়া উচিত নয়। এই পরিস্থিতিতে দলটির ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে।

দেশের বাইরে আওয়ামী লীগের সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা

বিদেশে অবস্থানরত কিছু নেতা দাবি করছেন, তারা দলকে সংগঠিত করার চেষ্টা করছেন। তবে বাস্তবতা হলো, তাদের কার্যক্রম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নির্ভর হয়ে পড়েছে। এসব প্রচেষ্টা দেশের অভ্যন্তরে নেতা-কর্মীদের মনোবলে কতটা প্রভাব ফেলতে পারছে, সেটাই এখন মূল প্রশ্ন। কিছু নেতা বলছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের ব্যর্থতা তাদের পক্ষে যেতে পারে, তবে তবে অন্তরবর্তী সরকার ইউনুস কে ব্যর্থ করার যত রকম গুজব রাটানো ষড়যন্ত্র, চক্রান্ত করার তা সবই আওয়ামী লীগের পালিয়ে বেড়ানো নেতারা করে চলেছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এটি শুধুমাত্র সাময়িক সুবিধা দিতে পারে, কিন্তু দলীয় কাঠামো পুনর্গঠনে সহায়ক হবে না বলেই মনে করেন।

সম্প্রতি একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলে জাতীয় পার্টির (বিজেপি) চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থ বলেন, ‘আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে এর নেতৃত্বের ওপর। দলটির ভেতর এখন শেখ হাসিনাকে বাদ দেওয়ার আলোচনা হতে পারে, কিন্তু তারা এতদিন ধরে শুধুমাত্র তার ওপর নির্ভরশীল ছিল, তাই নেতৃত্ব পরিবর্তনের সম্ভাবনা কম। দলটি নিষিদ্ধ হলে তাদের রাজনৈতিকভাবে টিকে থাকা সহজ হবে, কারণ তারা তখন আন্তর্জাতিক মহলে নিজেদের দমন-পীড়নের শিকার হিসেবে প্রচার করতে পারবে। তবে দলটি নিষিদ্ধ না হলে তাদের নেতৃত্ব ও রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন উঠবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘ওয়ান-ইলেভেনের সময় শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দলটি ঘুরে দাঁড়িয়েছিল, কারণ তখন তার প্রতি জনগণের সহানুভূতি ছিল। কিন্তু এখন আওয়ামী লীগ চোর, দুর্নীতিবাজ ও দুঃশাসনের প্রতীক হয়ে গেছে। তারা এখন আর আগের মতো জনগণের সমর্থন ফিরে পাবে না।’

কীভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে আওয়ামী লীগ

৫ আগস্টের পর থেকে ক্রমান্বয়ে বিদেশে পালিয়ে গিয়ে অবস্থানরত আওয়ামী নেতারা দাবি করছেন, তারা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দলকে সংগঠিত করছেন এবং অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে কোনো নির্বাচন হবে না—এই অবস্থান বজায় রাখার জন্য আন্তর্জাতিক মহলে লবিং চালাচ্ছেন। তবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, দেশের ভেতরে শক্তিশালী রাজনৈতিক অবস্থান তৈরি ছাড়া আওয়ামী লীগের জন্য ঘুরে দাঁড়ানো কঠিন হবে।
এমন এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখে আওয়ামী লীগ কতটা টিকে থাকতে পারবে, তা সময়ই বলে দেবে।

an adbox will go here