ছোট সোনা মসজিদ : সুলতানি স্থাপত্যের পাঁচশ বছরের ঐতিহ্য - দিগন্ত জার্নাল

ছোট সোনা মসজিদ : সুলতানি স্থাপত্যের পাঁচশ বছরের ঐতিহ্য

দিগন্ত জার্নাল ডেস্ক:

শনিবার, ৪ এপ্রিল ২০২৫ । চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার শাহবাজপুর ইউনিয়নের পিরোজপুর গ্রামে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তঘেঁষা এলাকায় অবস্থিত ছোট সোনা মসজিদ সুলতানি স্থাপত্যশৈলীর এক অনন্য নিদর্শন। প্রাচীন বাংলার রাজধানী গৌড় নগরীর উপকণ্ঠে মসজিদটি নির্মিত হয় সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহের আমলে (১৪৯৪–১৫১৯ খ্রিস্টাব্দ), যার তত্ত্বাবধানে ছিলেন ওয়ালি মোহাম্মদ আলি নামে এক ব্যক্তি। প্রায় পাঁচ শতাব্দী ধরে ইসলামি ঐতিহ্য ও স্থাপত্যের মহিমা বহন করে চলেছে এই মসজিদ।

ইতিহাসবিদদের মতে, ছোট সোনা মসজিদের গায়ে সোনালি আস্তর ছিল যা সূর্যের আলোয় ঝলমল করত, আর এ কারণেই এর নাম হয় ‘সোনা মসজিদ’। কেউ কেউ মনে করেন, সুলতানের স্ত্রীর নাম সোনা বিবি ছিল বলেও এই নামকরণ হতে পারে, আবার কেউ কেউ ধারণা করেন গম্বুজে সোনার প্রলেপ থাকায় এমন নাম হয়। পশ্চিমবঙ্গে বড় সোনা মসজিদ নামে আরেকটি মসজিদ রয়েছে, যার নামকরণও এই সূত্রেই বলে ধারণা করা হয়।

প্রাচীন রাজধানী গৌড়ে পাল আমল থেকে শুরু করে সুলতানি ও মুঘল আমলে গড়ে উঠেছিল অনেক স্থাপত্য, যার মধ্যে ছোট সোনা মসজিদ আজও টিকে আছে ইতিহাসের স্মারক হয়ে। মসজিদটি উত্তর-দক্ষিণে ৮২ ফুট লম্বা, পূর্ব-পশ্চিমে ৫২ ফুট চওড়া এবং উচ্চতা ২০ ফুট। ছয় ফুট পুরু ইটের দেওয়াল পাথর দিয়ে আবৃত, আর ভেতরে আটটি স্তম্ভসহ মোট ১৫টি গম্বুজ রয়েছে। বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো, বাইরে থেকে কেবল পাঁচটি গম্বুজ দেখা যায়, বাকিগুলো আড়ালে থেকে যায়।

মসজিদের অলংকরণে পাথর, ইট, টেরাকোটা ও টাইলস ব্যবহৃত হলেও পাথর খোদাইয়ের কারুকাজই সবচেয়ে দৃষ্টিনন্দন। দরজা, বুরুজ, তোরণজুড়ে রয়েছে সূক্ষ্ম খোদাই—লতাপাতা, ফুল, ঘণ্টা, ঝুলন্ত শিকল ইত্যাদি। এর ডান কোনায় রয়েছে বিচারকার্য পরিচালনার জন্য উঁচু একটি স্থান, যেখানে বসতেন ইমাম। দর্শনার্থীরা এখানে এসে যেমন মসজিদে নামাজ আদায় করেন, তেমনই ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে থাকা বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর ও বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর নাজমুল হকের সমাধিও পরিদর্শন করেন।

মসজিদের চার কোনায় রয়েছে অষ্টকোনাকৃতির ভিত্তির চারটি বুরুজ, যেগুলো ছাদের কার্নিশ পর্যন্ত বিস্তৃত। প্রবেশপথের কারুকার্যখচিত পাথরের তোরণের সামনেই রয়েছে সে আমলের সারি সারি কবর, যার দুটি বড় কালো পাথরে বাঁধানো। দক্ষিণ-পূর্ব পাশে রয়েছে মনোরম আমবাগান।

মসজিদের ইমাম মাওলানা মোহাম্মদ হিজবুল্লাহ জানান, প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত এবং শুক্রবার জুমার নামাজ হয়। ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার জামাতও হয় এখানে। পাশের সোনা মসজিদ স্থলবন্দর থেকে ভারী যানবাহন চলাচলের কারণে মসজিদে তীব্র কম্পন অনুভূত হয়, যা ভ্রমণকারীদের মাঝে আতঙ্ক সৃষ্টি করে এবং ভবিষ্যতে স্থাপত্যের ক্ষতির আশঙ্কাও বাড়ায়। তিনি বলেন, মসজিদ রক্ষায় বাইপাস সড়ক নির্মাণ এখন সময়ের দাবি।

an adbox will go here