জাতীয় শিক্ষাব্যবস্থা ঢেলে সাজাতে না পারলে মুখ থুবড়ে পড়বে ভবিষ্যৎ : রমযান রব্বানী - দিগন্ত জার্নাল

জাতীয় শিক্ষাব্যবস্থা ঢেলে সাজাতে না পারলে মুখ থুবড়ে পড়বে ভবিষ্যৎ : রমযান রব্বানী


দিগন্ত জার্নাল উপসম্পাদকীয় ✍️

রোববার, ১ জুন ২০২৫ | বাংলাদেশে গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে একটি ফ্যাসিবাদী সরকারের পতনের পর নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুললেও শিক্ষা ব্যবস্থার সংকট না কাটালে গণআকাঙ্ক্ষার ভবিষ্যৎ বাস্তবায়ন সম্ভব নয় বলে মন্তব্য করেছেন বিশ্লেষক রমযান রব্বানী। তার ভাষায়, “শিক্ষা কেবল জ্ঞানার্জনের মাধ্যম নয়—এটি একটি জাতির নৈতিকতা, সংস্কৃতি ও ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনার ভিত্তি।”

তিনি বলেন, দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা বহুদিন ধরে অবকাঠামোগত দুর্বলতা, নীতিগত দ্বন্দ্ব, দলীয় প্রভাব, দুর্নীতি ও শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য থেকে বিচ্যুতির কারণে গভীর সংকটে রয়েছে। তিনি অভিযোগ করেন, একদিকে শিক্ষকরা নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন, অন্যদিকে ছাত্রদের কাছে শিক্ষা মানে শুধুই পাস—আসল জ্ঞান নয়।

স্বাধীনতার পর থেকে একাধিক শিক্ষানীতির প্রচেষ্টা থাকলেও তা রাজনৈতিক রঙে রঞ্জিত, স্বল্পমেয়াদি ও বাস্তবায়নে দুর্বল ছিল বলে মনে করেন রমযান। তিনি বলেন, “বাংলা ও ইংরেজি মাধ্যমের মধ্যে বিভাজনের ফলে ছাত্রদের দৃষ্টিভঙ্গি, স্বপ্ন ও মানসিকতায় ফাটল সৃষ্টি হচ্ছে।” তিনি পাঠ্যসূচির রাজনৈতিক প্রভাব, বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্নতা এবং মুখস্থনির্ভর শিক্ষার বিপরীতে বিশ্লেষণ ও দক্ষতাভিত্তিক পাঠ্যক্রমের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন।

নকল, প্রশ্নফাঁস, ছাত্ররাজনীতির নামে সন্ত্রাস, গবেষণার প্রতি অবহেলা, টেকনিক্যাল ও ভোকেশনাল শিক্ষার প্রতি প্রশাসনিক উদাসীনতা এবং শিক্ষক মর্যাদার অভাব—এসবকে একত্রে শিক্ষাব্যবস্থার বহুমাত্রিক সংকট হিসেবে চিহ্নিত করেন তিনি।

এই সংকট উত্তরণে তিনি যে সমাধানগুলো প্রস্তাব করেন তার মধ্যে রয়েছে: একটি স্থায়ী ও সময়োপযোগী শিক্ষানীতি প্রণয়ন, বৈষম্যহীন একমুখী শিক্ষা ব্যবস্থা, চিন্তাশীল ও দক্ষতাভিত্তিক পাঠ্যক্রম, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ ও মর্যাদা নিশ্চিত করা, নকল ও প্রশ্নফাঁস রোধে প্রযুক্তিনির্ভরতা এবং ছাত্ররাজনীতিকে দলীয় ছত্রছায়ামুক্ত করা।

জাতীয় পাঠ্যক্রমে বিকৃত যৌন পরিচয়: আত্মপরিচয়ের সঙ্কটে নতুন প্রজন্ম

রমযান রব্বানী পাঠ্যপুস্তকে ট্রান্সজেন্ডার মতবাদ অন্তর্ভুক্তিকে একটি নীতিগত বিপর্যয় হিসেবে দেখছেন। তিনি বলেন, “বাংলাদেশের ধর্মনির্ভর সমাজব্যবস্থায় এটি শুধু অপ্রয়োজনীয় নয়, বরং আত্মপরিচয়ের বিভ্রান্তি ও বিশ্বাস কাঠামোর ওপর আঘাত।” তিনি ইসলামী দৃষ্টিকোণ, সমাজতাত্ত্বিক বাস্তবতা এবং মনোবিকাশের পরিপ্রেক্ষিতে এই অন্তর্ভুক্তিকে স্পষ্টভাবে প্রত্যাখ্যানযোগ্য বলেন।

তাঁর মতে, “ট্রান্সজেন্ডার ধারণা জৈবিক লিঙ্গকে অস্বীকার করে ‘মানসিক অনুভূতিকে’ মূল ধরে যা ইসলামী আকীদার বিরুদ্ধে যায়।” পাশাপাশি তিনি প্রশ্ন তোলেন, “রাষ্ট্রীয় পাঠ্যক্রমে এমন বিতর্কিত ধারণা যুক্ত করে আমরা কি আমাদের সন্তানদের আত্মপরিচয়হীন, ধর্ম-বিচ্যুত ও সাংস্কৃতিকভাবে পরাজিত প্রজন্মে পরিণত করতে চাই?”

ইসলামী ফরজী বিষয়সমূহ বাদ : শিক্ষা ব্যবস্থার আরেক সংকট

তিনি বলেন, “দেশের ৯০ শতাংশ মানুষ মুসলমান হলেও শিক্ষাক্রমে ফরজী বিষয়সমূহ যথাযথ গুরুত্বে নেই।” নামাজ, রোজা, যাকাত, ঈমান ইত্যাদি মৌলিক বিষয়কে শ্রেণিভিত্তিক ও ধারাবাহিকভাবে অন্তর্ভুক্ত করার অভাবকে তিনি জাতীয় শিক্ষাব্যবস্থার অন্যতম বড় ঘাটতি হিসেবে তুলে ধরেন।

তাঁর পর্যালোচনায় প্রস্তাবিত করণীয় পদক্ষেপগুলো হলো— ১. প্রতিটি শ্রেণিতে বয়স উপযোগী ফরজী বিষয় বাধ্যতামূলকভাবে অন্তর্ভুক্ত করা;
২. ব্যবহারিক ইসলামী শিক্ষা চালু করা;
৩. ইসলাম বিষয়ের শিক্ষকদের মানসম্মত প্রশিক্ষণ দেওয়া;
৪. পাঠ্যপুস্তকগুলো যুগোপযোগী ও বৈজ্ঞানিকভাবে উপস্থাপন করা।

সবশেষে তিনি বলেন, “একটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্র হিসেবে ইসলামি ফরজী বিষয়গুলো শিক্ষা ব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্তি শুধু ধর্মীয় দায়িত্ব নয়, এটি জাতীয় আত্মপরিচয় রক্ষারও শর্ত।”


an adbox will go here