খুনি হাসিনার দোসর পুলিশ কর্মকর্তাদের পদোন্নতি ও বঞ্চিতদের হতাশা - দিগন্ত জার্নাল

খুনি হাসিনার দোসর পুলিশ কর্মকর্তাদের পদোন্নতি ও বঞ্চিতদের হতাশা

দিগন্ত জার্নাল ডেস্ক:

২৪ সালের জুলাই-আগস্ট আন্দোলনে ( জুলাই-বিপ্লব) ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ভারতে পালিয়ে যাওয়া ফ্যাসিবাদ শেখ হাসিনার দোসর হিসেবে চিহ্নিত শতাধিক পুলিশ কর্মকর্তা এখনও সরকারি পদে বহাল তবিয়তে আছেন, যাদের মধ্যে বেশিরভাগই গত সাড়ে ১৫ বছর ধরে সরকার ও তার বিভিন্ন অপকর্মে সরাসরি সহযোগিতা করেছেন। বিশেষত ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় তারা সরকারের নানা অপকর্মে অংশ নিয়েছিলেন। নির্বাচনী কাজে তারা একদিকে যেমন আওয়ামী লীগ সরকারের পক্ষ থেকে দায়িত্ব পালন করেছেন, অন্যদিকে, ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর একেবারে ভোল পালটে বিএনপি ও জামায়াতের অন্ধ সমর্থক হিসেবে পরিচিত হয়েছেন।

এই কর্মকর্তারা সরকারের নানা সিদ্ধান্তে অন্ধভক্ত হিসেবে ভূমিকা রেখেছেন। তাদের মধ্যে অনেকেই বিভিন্ন সময়ে ‘ম্যানেজ’ করে গুরুত্বপূর্ণ পদ, যেমন এসপি, ডিআইজি, অতিরিক্ত আইজিপি, বাগিয়ে নিয়েছেন। তাদের পদোন্নতিতে মেধা, যোগ্যতা বা জ্যেষ্ঠতার কোনো ভূমিকা নেই, বরং রাজনৈতিক সুবিধাবাদী মনোভাবই তাদের পদোন্নতির মূল কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এদিকে, যেসব পুলিশ কর্মকর্তা মেধা, জ্যেষ্ঠতা এবং অন্যান্য যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত হয়েছেন, তাদের মধ্যে চরম হতাশা ও ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। এসব কর্মকর্তারা প্রশ্ন তুলছেন, “২০১৪ সালে গোপালগঞ্জের মতো একটি জেলার এসপি হিসেবে যে কর্মকর্তার কর্মরত ছিলেন, তিনি আজ নৌপুলিশের ডিআইজি হয়ে গেছেন। অথচ তাদের মধ্যে অনেক মেধাবী কর্মকর্তা এখনো পদোন্নতি পাননি।”

তবে, পুলিশের আইজি বাহারুল আলম এই বিষয়টিতে সাফ জানিয়ে দেন, “সরকার যেভাবে সিদ্ধান্ত নেবে, সেভাবেই তা বাস্তবায়ন করা হবে। ইতোমধ্যে ২০১৮ সালের নির্বাচনে যারা সক্রিয় ছিলেন তাদের ওএসডি করা হয়েছে। সরকারের পরবর্তী সিদ্ধান্তে ২০১৪ এবং ২০২৪ সালের নির্বাচনে দায়িত্ব পালনকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” এ ধরনের পদক্ষেপের পরও অনেক কর্মকর্তা নিশ্চিত যে, বিগত সরকারের পক্ষে কাজ করা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে না, যেহেতু তারা সবাই একে অপরের সঙ্গে সম্পর্কিত।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, “বিএনপি এবং আওয়ামী লীগ—এ দুটি দলের মধ্যেই সুবিধাবাদী দলের সদস্যরা থাকে, যারা একে অপরের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া করে এবং রাজনৈতিক পরিবেশের সাথে নিজের অবস্থান পরিবর্তন করে। তাদের শীর্ষ পদে অধিষ্ঠিত হওয়া শুধু দলীয় তেলমারাদের কারণে। তাদের পেশাদারিত্বের প্রতি কোনো আস্থা রাখা যায় না।”

এছাড়া, সরকারের একাধিক পদক্ষেপে তাদের পক্ষ থেকে যারা বিশেষ ভূমিকা রেখেছেন, তাদের অনেককেই পদক দেওয়া হয়েছে, যা নিয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে। এসব পদক পাওয়া কর্মকর্তাদের মধ্যে ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪ সালের নির্বাচনে বিশেষ ভূমিকা ছিল, তবে তাদের মধ্যে অনেকের বিরুদ্ধে রয়েছে অপরাধের অভিযোগ কিংবা তাদের বিরুদ্ধে চলমান মামলা। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন—২০১৪ সালের জাতীয় নির্বাচনে গোপালগঞ্জের এসপি মো. মিজানুর রহমান, যিনি পরে ব্রাহ্মণবাড়িয়া এবং নৌপুলিশের ডিআইজি পদে পদোন্নতি পান। একইভাবে, কুসুম দেওয়ান, মো. হাসানুজ্জামান, আব্দুল্লাহ হেল বাকী, মো. সাইফুজ্জামান প্রমুখ কর্মকর্তাদের পদোন্নতি নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে।

এসব কর্মকর্তাদের একে একে পদোন্নতি দেওয়া হলেও, যারা খাঁটি পেশাদার পুলিশ কর্মকর্তা, তাদের পদোন্নতি আটকে রাখা হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, ১৫তম বিসিএস কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ হেল বাকী, যিনি মেধা অনুযায়ী দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেছিলেন, তাকে পুলিশ সুপার হিসেবে বাধ্যতামূলক অবসর দেওয়া হয়। তবে, কিছু সুবিধাবাদী কর্মকর্তাকে পুরস্কৃত করা হয়েছে, যাদের পেছনে রয়েছে রাজনৈতিক সংযোগ এবং ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক।

বিগত ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন নির্বাচনে বিশেষ ভূমিকা রাখা কর্মকর্তাদের পুরস্কৃত করা এবং তাদের পদোন্নতি দান নিয়ে বিশেষ উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, যেহেতু এসব কর্মকর্তাদের পেশাদারিত্ব এবং নৈতিকতা প্রশ্নবিদ্ধ। এমনকি, বিভিন্ন মামলা চলমান থাকা সত্ত্বেও কিছু কর্মকর্তাকে পদক প্রদান করা হয়েছে, যার ফলে এ পদকগুলি বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে।

এভাবে, পুলিশের বিভিন্ন স্তরে সুবিধাবাদী দলীয় কর্মকর্তাদের কর্তৃত্বের সুযোগ বেড়েছে, যা দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। সরকারি পদোন্নতির এই পরিস্থিতি ভবিষ্যতে আরও সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে, বিশেষত যখন তারা পুলিশ বাহিনীর পেশাদারিত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করবে এবং সরকারের প্রতি জনগণের আস্থা কমিয়ে দেবে।

an adbox will go here