ঐতিহাসিক কুতুবশাহী মসজিদ সংরক্ষণে জরুরি উদ্যোগ প্রয়োজন - দিগন্ত জার্নাল

ঐতিহাসিক কুতুবশাহী মসজিদ সংরক্ষণে জরুরি উদ্যোগ প্রয়োজন

দিগন্ত জার্নাল ডেস্ক:

বাংলার মুঘল আমলের ইসলামি স্থাপত্যকলার অপূর্ব নিদর্শন কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রাম সদরের কুতুবশাহী মসজিদ। পাঁচ গম্বুজবিশিষ্ট এ মসজিদটি বাংলার সুলতানি ও মুঘল স্থাপত্য বৈশিষ্ট্যে নির্মিত হলেও দীর্ঘদিন ধরে অযত্ন-অবহেলায় রয়েছে। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের অধীনে থাকা এই ঐতিহাসিক স্থাপনার সংরক্ষণ ও সংস্কারের অভাবে এটি ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেছে।

সংরক্ষণে অবহেলা ও অবস্থা

অষ্টগ্রাম রোটারি কলেজের সহকারী অধ্যাপক সৈয়দা নাসিমা ইসলাম রীতা জানান, ঐতিহাসিক এই মসজিদটি প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের আওতায় থাকলেও তারা কার্যত কোনো সংরক্ষণমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। কেবলমাত্র একটি সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দায়িত্ব শেষ করেছে বলে মনে হয়। ফলে দীর্ঘদিনের অবহেলায় মসজিদটির বিভিন্ন স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

তিনি আরও জানান, অতীতের একটি সরকারের আমলে কে বা কারা মানতের কথা বলে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে মসজিদের আঙিনায় বড় বড় পিলার স্থাপন করেছে, যা মসজিদের মূল সৌন্দর্যে বিঘ্ন সৃষ্টি করেছে। ফলে এর ঐতিহ্যগত স্থাপত্যশৈলী নষ্ট হয়েছে। মসজিদটিকে প্রভাবশালী গোষ্ঠীর অযাচিত হস্তক্ষেপ থেকে রক্ষা করার দাবি জানিয়েছেন তিনি।

এ বিষয়ে অষ্টগ্রাম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা দিলশাদ জাহান গণমাধ্যমকে জানান, মসজিদটি প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে থাকলেও ছোটখাটো অধিকাংশ বিষয় উপজেলা পরিষদ দেখে আসছে। অতিরিক্ত মুসল্লিদের নামাজ আদায়ের সুবিধার জন্য উপজেলা পরিষদের পক্ষ থেকে ত্রিপল (শামিয়ানা) টানানো এবং বিদ্যুতের জন্য একটি জেনারেটরের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, “এলাকাটি সম্পূর্ণ হাওড়বেষ্টিত হওয়ায় দর্শনার্থীদের সুবিধার জন্য আশপাশের রাস্তাঘাট সংস্কার করা হয়েছে। তবে মসজিদটির মৌলিক সংস্কার বা বড় ধরনের সংরক্ষণ প্রয়োজন কি না, তা একমাত্র প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরই ভালো বলতে পারবে।”

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও স্থাপত্যশৈলী

ইতিহাসবেত্তাদের মতে, কুতুবশাহী মসজিদটি ১৭ শতকের প্রথমদিকে নির্মিত হয়। কেউ কেউ এটিকে ১৬ শতকের স্থাপনা বলে দাবি করলেও অধিকাংশ গবেষক একে ১৭ শতকের মসজিদ হিসেবেই চিহ্নিত করেন। মসজিদটির নামকরণ করা হয়েছে ওই আমলের বিখ্যাত দরবেশ কুতুব শাহের নামে।

স্থাপত্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, সুলতানি ও মুঘল স্থাপত্যশৈলীর সংমিশ্রণে মসজিদটি নির্মিত হয়েছে। মসজিদের দৈর্ঘ্য ৪৬ ফুট ১১ ইঞ্চি এবং প্রস্থ ২৭ ফুট ১১ ইঞ্চি। এর কার্নিশগুলো বাংলার ঐতিহ্যবাহী চৌচালা ঘরের চেয়েও অধিক বক্র। মসজিদের চার কোণে আটকোণবিশিষ্ট চারটি নকশাকৃত মিনার রয়েছে।

মসজিদের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এর পাঁচটি গম্বুজ। পশ্চিম দেওয়ালে তিনটি মেহরাব রয়েছে, যা ইসলামি স্থাপত্যশৈলীর সৌন্দর্যকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে। পূর্ব দেওয়ালে তিনটি এবং উত্তর ও দক্ষিণ দেওয়ালে দুটি করে চারটি প্রবেশপথ রয়েছে, যার সবকটিই সুলতানি খিলানযুক্ত। গম্বুজগুলোর চূড়ায় রয়েছে নান্দনিক অলংকরণ, যা বাংলার মুঘল স্থাপত্যশৈলীর অনন্য নিদর্শন বহন করে।

মসজিদের দক্ষিণ পাশে রয়েছে একটি কবরসদৃশ স্থাপনা, যা অনেকের মতে কুতুব শাহের সমাধি হতে পারে। শত শত বছর ধরে ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা এই মসজিদে নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করে আসছেন।

সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় ১৯০৯ সালে মসজিদটিকে সংরক্ষিত পুরাকীর্তি ঘোষণা করা হয়। তবে দীর্ঘ এক শতকেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে উল্লেখযোগ্য কোনো সংরক্ষণ বা সংস্কার কাজ লক্ষ করা যায়নি।

প্রতিদিন দেশ-বিদেশের শত শত পর্যটক ও ইতিহাসপ্রেমী মানুষ মসজিদটি দেখতে আসেন। কিন্তু যথাযথ সংরক্ষণ ও সংস্কারের অভাবে এটি দিন দিন নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, মসজিদটির স্থাপত্যশৈলী রক্ষা করতে হলে অবিলম্বে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি। এটি শুধু ধর্মীয় স্থান নয়, বরং বাংলাদেশের স্থাপত্য ও ঐতিহ্যের এক অমূল্য নিদর্শন।

স্থানীয়রা ও ইতিহাসপ্রেমীরা দাবি জানিয়েছেন, দ্রুত প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর কর্তৃক সংস্কারকাজ পরিচালনা করা হোক, যাতে এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সংরক্ষিত থাকে। সময়ের দাবি মসজিদটির যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করা এবং এর ঐতিহ্যগত সৌন্দর্য অক্ষুণ্ন রাখা।

an adbox will go here