গুজরাটে কথিত বাংলাদেশি ধরতে অভিযানে বিপাকে ভারতীয় মুসলমান শ্রমিকরা - দিগন্ত জার্নাল

গুজরাটে কথিত বাংলাদেশি ধরতে অভিযানে বিপাকে ভারতীয় মুসলমান শ্রমিকরা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:

সোমবার, (২৮ এপ্রিল ২০২৫) গুজরাট, ভারত: ভারতের গুজরাট রাজ্যে কথিত বাংলাদেশি নাগরিকদের খোঁজে পুলিশের অভিযানে বিপাকে পড়েছেন পশ্চিমবঙ্গসহ বিভিন্ন রাজ্যের মুসলমান শ্রমিক ও সাধারণ মানুষ। গত শনিবার ভোর থেকে শুরু হওয়া এ অভিযানে সোমবার রাত পর্যন্ত প্রায় ৬,৫০০ জনকে আটক করেছে পুলিশ। গুজরাট রাজ্য পুলিশের মহাপরিচালক বিকাশ সহায় জানিয়েছেন, আটককৃতদের মধ্যে এখন পর্যন্ত ৪৫০ জন যে বাংলাদেশি নাগরিক, তা নথিপত্রের ভিত্তিতে নিশ্চিত হওয়া গেছে। বাকিদের বিষয়ে তদন্ত চলছে।

আহমেদাবাদ ও সুরাতে অভিযান শুরু হলেও পরে তা ছড়িয়ে পড়ে গোটা গুজরাট জুড়ে। অভিযানের আওতায় পড়েন বহু ভারতীয় নাগরিকও, যাদের পরিচয়পত্র থাকা সত্ত্বেও সন্দেহের ভিত্তিতে আটক করা হয়। সুরাতের বাসিন্দা সুলতান মল্লিক, যিনি পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম জেলার নাগরিক, তিনিও এই অভিযানে আটক হন। তার স্ত্রী সাহিনা বিবি জানান, রাত তিনটায় পুলিশ বাসায় হানা দিয়ে আধার কার্ড চায় এবং মল্লিক ও তার দুই ভাগ্নেকে ধরে নিয়ে যায়। যদিও মল্লিকের কাছে ভারতের বৈধ পাসপোর্ট ও জমির দলিল রয়েছে, তবুও তিন দিন পার হয়ে গেলেও তাদের আদালতে হাজির করা হয়নি।

মেহেন্দি করা হাতে বিয়ের আয়োজন করা ফারজানা জানান, বরযাত্রীদের থাকার জায়গা থেকে তাদের ধরে নিয়ে যায় পুলিশ। তার ভাই ও ভাতিজা মহারাষ্ট্রের আকোলা থেকে এসেছিলেন। জন্মসনদ ও আধার কার্ড থাকা সত্ত্বেও দিনভর হেনস্থা শেষে রাতে তাদের ছাড়া হয়। এদের কেউই বাংলাদেশি বা এমনকি বাংলাভাষীও নন।

আহমেদাবাদের বাসিন্দা আলমআরা পাঠান জানান, তার ছেলে ও পুত্রবধূকে শ্বশুরবাড়িতে যাওয়ার সময় পুলিশ তুলে নিয়ে যায়। সব পরিচয়পত্র জমা দেওয়ার পর তাদের ছাড়া হলেও পুনরায় হাজিরা দিতে বলা হয়েছে।

পশ্চিমবঙ্গের হাওড়ার বাসিন্দা নূর শেখ জানান, চা খেতে যাওয়ার পথে বন্ধুর মাধ্যমে জানতে পারেন, একই জেলার একজনকে পুলিশ তুলে নিয়ে গেছে। তিনি বলেন, “আমরা তো ভারতীয় নাগরিক, তবুও এভাবে ধরপাকড় কেন?”

‘পরিযায়ী শ্রমিক ঐক্য মঞ্চ’ নামের সংগঠনটি জানিয়েছে, শুধু গুজরাটেই নয়, উত্তরপ্রদেশ, ওড়িশা, মহারাষ্ট্রসহ অন্যান্য রাজ্যেও পশ্চিমবঙ্গের বাংলাভাষী মুসলমানদের ‘বাংলাদেশি’ তকমা দিয়ে হেনস্থা করা হচ্ছে। সংগঠনটির রাজ্য সম্পাদক আসিফ ফারুক বলেন, “সারা দেশ থেকে শতাধিক অভিযোগ পেয়েছি আমরা। এ নিয়ে আমরা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহকে চিঠি দিয়েছিলাম, কিন্তু কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।”

তিনি জানান, গত ১৮ এপ্রিল মালদার ২৩ জন ফেরিওয়ালাকে উত্তরপ্রদেশে মারধর করে আটক করা হয়, যাদের একদিন পর ছাড়া হয়। ২১ এপ্রিল মুর্শিদাবাদের ৬০ জন শ্রমিককে ওড়িশায় হেনস্থা করে ফিরিয়ে পাঠানো হয়। ভদ্রকে এক ফেরিওয়ালাও একইভাবে আক্রান্ত হন।

আসিফ ফারুক প্রশ্ন তোলেন, “ভারতের নাগরিক হিসেবে কী দেশের যেকোনো জায়গায় গিয়ে কাজ করার বা ব্যবসা করার অধিকার নেই বাংলাভাষী মুসলমানদের?” তিনি বলেন, ২০১৪ সাল থেকে এমন ঘটনা বাড়ছে, আর সাম্প্রতিক কিছু ঘটনার পরে তা আরও ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে।

এই পরিস্থিতিতে গুজরাট পুলিশের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে, সীমান্তঘেঁষা রাজ্যগুলোর পরিচয়পত্র যাচাই করতে তারা বিশেষ দল পাঠাবে, যাতে ‘বাংলাদেশি’ সন্দেহে আটক ব্যক্তিদের প্রকৃত পরিচয় নির্ধারণ করা যায়। তবে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই পদক্ষেপ বহু নিরপরাধ ভারতীয় মুসলমানকে হয়রানির মুখে ফেলবে।

an adbox will go here