ফারাক্কা বাঁধ: পঞ্চাশ বছরের অর্জন, বিতর্ক ও ভবিষ্যৎ - দিগন্ত জার্নাল

ফারাক্কা বাঁধ: পঞ্চাশ বছরের অর্জন, বিতর্ক ও ভবিষ্যৎ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
ভারত ও বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের অন্যতম দীর্ঘমেয়াদী অস্বস্তির কারণ ফারাক্কা বাঁধ। ভারতের দৃষ্টিতে এটি ‘ফারাক্কা ব্যারাজ প্রজেক্ট’ হিসেবে পরিচিত। বহু আলোচনা, বিরোধ ও রাজনৈতিক আলোড়ন পেরিয়ে ২০২৫ সালে এই প্রকল্পটির ৫০ বছর পূর্ণ হয়েছে।

বাংলাদেশের অভিযোগ ও ভারতের অবস্থান

বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে এসেছে যে ফারাক্কার কারণেই পদ্মার পানিপ্রবাহ কমে গেছে, নদী শুকিয়ে যাচ্ছে, ফলে জীবন-জীবিকা হুমকির মুখে। অপরদিকে, ভারত বরাবরই যুক্তি দিয়েছে যে, কলকাতা বন্দরের অস্তিত্ব রক্ষায় ফারাক্কা অপরিহার্য ছিল। ১৯৯৬ সালে ভারত ও বাংলাদেশ ৩০ বছরের জন্য গঙ্গা পানিচুক্তি স্বাক্ষর করে, যার মেয়াদ প্রায় শেষের পথে। চুক্তির নবায়ন নিয়ে আলোচনার মাঝেও ফারাক্কা নিয়ে বিরোধ থামেনি।

ফারাক্কা প্রকল্পের জন্ম ও উদ্দেশ্য

ফারাক্কা প্রকল্পের মূল লক্ষ্য ছিল গঙ্গার পানিপ্রবাহকে পদ্মা থেকে সরিয়ে ভাগীরথীর দিকে নিয়ে যাওয়া, যাতে কলকাতা বন্দরের নাব্যতা রক্ষা করা যায়। এজন্য ৪০ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি ‘লিঙ্ক ক্যানাল’ কাটা হয় এবং ১৯৭৫ সালে ইন্দিরা গান্ধীর মাধ্যমে এটি উদ্বোধন করা হয়। প্রকল্পের বর্তমান প্রধান আর ডি দেশপান্ডে মনে করেন, কলকাতা বন্দরকে রক্ষা করার ক্ষেত্রে ফারাক্কা পুরোপুরি সফল। তিনি জানান, আগে গঙ্গার মূল প্রবাহ ভাগীরথী দিয়ে যেত, যা ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি মাত্র।

বৈজ্ঞানিক ও ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ

গবেষক ড. পার্থসারথি চক্রবর্তীর মতে, ফারাক্কার আগে কলকাতা বন্দরে ২৬ ফুট গভীরতা পর্যন্ত জাহাজ প্রবেশ করত, কিন্তু পরে তা সম্ভব হচ্ছিল না। সেই সমস্যা সমাধানের জন্যই ফারাক্কা ছিল যৌক্তিক। তিনি বলেন, ফারাক্কায় ফিডার ক্যানালের পানি পলিমুক্ত রাখা হয়, যা কলকাতায় পানীয় হিসেবেও ব্যবহৃত হয়। ফারাক্কার ক্যানাল, জলপথ, মাছের উৎপাদন ও বিদ্যুৎকেন্দ্র ঘিরে একটি ‘ইকোসিস্টেম’ গড়ে উঠেছে। ফারাক্কা আজ শুধুই বাঁধ নয়, বরং একটি সম্পূর্ণ পরিবেশ ও অর্থনৈতিক বলয়।

ভারতের অভ্যন্তরীণ বিতর্ক

ভারতের অভ্যন্তরেই ফারাক্কা নিয়ে ব্যাপক মতবিরোধ রয়েছে। প্রকৌশলী কপিল ভট্টাচার্য ফারাক্কার বিরোধিতা করে সরকারি চাকরি ছাড়েন। ২০১৬ সালে বিহার সরকার ফারাক্কা তুলে দেওয়ার প্রস্তাব দেয়, তাদের অভিযোগ বাঁধের কারণে বারবার বন্যা হয়। বিহার ও ঝাড়খন্ডের মানুষজন বর্ষায় বাঁধের গেট না খোলার অভিযোগ তোলেন, আবার শুষ্ক মৌসুমে পানি না পাওয়ায় কৃষির ক্ষতির কথাও বলেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. সুমনা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ফারাক্কা নদীর স্বাভাবিক গতিপথে রুদ্ধতা সৃষ্টি করেছে, ফলে নদীর কোর্স ও গতি পরিবর্তন হয়েছে।

ভবিষ্যৎ ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ

ফারাক্কার নির্বাচিত প্রতিনিধি এমএলএ মনিরুল ইসলাম জানান, যদিও ফারাক্কা যোগাযোগ ব্যবস্থায় উন্নয়ন এনেছে, নদীভাঙন ঠেকাতে ড্রেজিং না করলে তা ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনবে। তার দাবি, মাঝনদীটি পাথর দিয়ে বেঁধে দিলে বহু মানুষ জমি ও বাড়ি হারানো থেকে রক্ষা পাবে। নীতিশ কুমারের প্রস্তাবে একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন হলেও, পর্যাপ্ত তথ্য না পাওয়ায় তা কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেনি। তবে বিশেষজ্ঞ হিমাংশু ঠক্কর বলেন, ফারাক্কার বিরূপ প্রভাব নিয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই।

ফারাক্কা বাঁধ একটি টেকনিক্যাল, ভূরাজনৈতিক ও মানবিক ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। গত পঞ্চাশ বছরে এটি যেমন অর্জন দিয়েছে, তেমনি বিতর্কও সৃষ্টি করেছে। গঙ্গা চুক্তির নবায়ন, জলবন্টনের ন্যায্যতা এবং নদী ব্যবস্থাপনায় টেকসই সমাধানই ভবিষ্যতের চাবিকাঠি।

an adbox will go here