পাক-ভারত উত্তেজনা তুরস্ক-পাকিস্তান ঘনিষ্ঠতা নতুন মোড়ে
আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
কাশ্মীরের পহেলগাঁওয়ে বন্দুক হামলায় ২৬ জন নিহত হওয়ার পর ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে নতুন করে সামরিক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। ভারত পাকিস্তানকে দায়ী করে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালালে পাল্টা জবাবে ইসলামাবাদও ড্রোন হামলা চালায়। তবে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় শনিবার দুই দেশ যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়। এই সংঘাতে আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়ায় একটি গুরুত্বপূর্ণ মাত্রা যোগ করে তুরস্ক ও ইসরাইল। বিশ্বের অধিকাংশ দেশ নিরপেক্ষ অবস্থান নিলেও তুরস্ক সরাসরি পাকিস্তানের পক্ষে অবস্থান নেয় এবং ইসরাইল প্রকাশ্যে সমর্থন জানায় ভারতকে।
তুরস্কের ‘ভ্রাতৃত্ব’ ও সামরিক সহায়তা
তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তায়্যেপ এরদোয়ান পাকিস্তানিদের ‘ভাই’ আখ্যায় দিয়ে আল্লাহর দরবারে তাদের জন্য দোয়া করার কথা বলেন। তুরস্কের একটি যুদ্ধজাহাজ করাচি বন্দরে এবং একটি সি-১৩০ বিমান ইসলামাবাদে অবতরণ করে, যা সামরিক বন্ধুত্বের নিদর্শন হিসেবে উল্লেখ করা হয়। ভারতের দাবি, পাকিস্তান ৩০০-৪০০ তুর্কি ড্রোন ব্যবহার করে ভারতের বিভিন্ন শহরে হামলা চালায়। অন্যদিকে, পাকিস্তানও অভিযোগ করেছে, ভারত ইসরাইলি ড্রোন ব্যবহার করছে।
ধর্মীয় মতাদর্শিক সম্পর্কের প্রভাব
বিশ্লেষকদের মতে, তুরস্ক ও পাকিস্তানের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। তবে এরদোয়ান শাসনামলে ধর্মভিত্তিক ঐক্য ও ইসলামি ইস্যুকে গুরুত্ব দিয়ে এই সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হয়েছে। সৌদি আরবে ভারতের সাবেক রাষ্ট্রদূত তালমিজ আহমেদ বলেন, “এরদোয়ান নিজেকে ইসলামি বিশ্বের নেতা হিসেবে তুলে ধরতে চান। কাশ্মীরকে তিনি ধর্মীয় ইস্যু হিসেবে দেখেন।” তুরস্ক-পাকিস্তান সামরিক সহযোগিতার ইতিহাসও দীর্ঘদিনের। তবে এরদোয়ান সময়কালে এ সহযোগিতা আরও ঘনীভূত হয়।
আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারে তুরস্কের কৌশল
তুরস্ক দীর্ঘদিন ধরে ইসলামি বিশ্বের নেতৃত্বে আসার চেষ্টা করছে, যদিও সৌদি আরবের কারণে তা বাস্তবায়ন হয়নি। ২০১৯ সালে মালয়েশিয়া, ইরান ও পাকিস্তানকে নিয়ে একটি বিকল্প জোট গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও সৌদি চাপের কারণে পাকিস্তান শেষ পর্যন্ত সে সম্মেলনে যোগ দেয়নি। তালমিজ আহমেদ মনে করেন, তুরস্ক সামরিক শিল্পে পাকিস্তানকে একটি বাজার হিসেবে দেখছে, আর সেই প্রেক্ষাপটে ধর্মীয় ঐক্যকে সামনে এনে সম্পর্ক জোরদার করছে।
তুরস্ক-ভারত সম্পর্ক: অবিশ্বাসের ছায়া
নরেন্দ্র মোদি এখনও তুরস্ক সফর করেননি, যা দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কে অস্বস্তির ইঙ্গিত দেয়। তুরস্ক সবসময় কাশ্মীর ইস্যুতে ভারতের বিরোধিতা করে আসছে, যা দুই দেশের সম্পর্ককে দুর্বল করেছে।
ইসলামি জোটে ভাঙন?
ওআইসি যদিও দুই দেশকে উত্তেজনা কমাতে বলেছে, তবে কাশ্মীর ইস্যুতে পাকিস্তানকেই সমর্থন দিয়েছে। ভারতের বিরুদ্ধে প্রমাণ না থাকার কথাও বলা হয়েছে। অন্যদিকে, সৌদি আরব পাকিস্তানকে অর্থনৈতিকভাবে সহায়তা দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে, যা তুরস্ক এখনও ততটা করেনি।
** সামরিক স্বার্থ, ধর্মীয় ঐক্য না ভূরাজনৈতিক কৌশল?**
তুরস্ক ও পাকিস্তানের সম্পর্ক এখন মতাদর্শ, সামরিক সহযোগিতা ও কৌশলগত লক্ষ্য—এই তিনের সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে। এটি শুধু ভ্রাতৃত্ব নয়, বরং মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ায় প্রভাব বিস্তারের একটি সুপরিকল্পিত পদক্ষেপ। তবে এই সম্পর্ক কতটা টেকসই হবে, তা নির্ভর করছে আগামী দিনগুলোর ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা ও তুরস্ক-পাকিস্তানের পারস্পরিক স্বার্থ কতটা মিলবে তার ওপর।