নেত্রকোনার ‘স্বপ্নবুনন’ বদলে দিচ্ছে নারীদের জীবন - দিগন্ত জার্নাল

নেত্রকোনার ‘স্বপ্নবুনন’ বদলে দিচ্ছে নারীদের জীবন

প্রতিবেদক | তাসমিয়া তহুরা

বুধবার, ২ জুলাই ২০২৫

একটি সুই, একটু সূতা-যার ছোঁয়ায় শুধু কাপড় নয়, বদলে যাচ্ছে জীবন।
নেত্রকোনা শহরের ইসলামপুর এলাকায় গড়ে ওঠা ‘স্বপ্নবুনন সেলাই শিখন’ এমনই একটি স্বপ্নঘেরা আশ্রয়স্থল, যেখানে নারীরা রূপ নিচ্ছেন পরনির্ভরশীলতা থেকে আত্মনির্ভরতার প্রতীকে।

এই প্রশিক্ষণ কেন্দ্রটির প্রতিষ্ঠাতা তাহমিদা ইসলাম—একজন নারীর জেদ, দায়বদ্ধতা আর ভালোবাসা মিলিয়ে তৈরি এক অনন্য চরিত্র। নিজ হাতে গড়ে তুলেছেন একটি প্রতিষ্ঠান, যা আজ একা নয়, শত শত নারীর জীবনের ভরসা হয়ে উঠেছে।

এক সূতোয় গাঁথা শুরু

২০০৫ সাল। মাত্র তিনজন ছাত্রীকে নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিলেন তাহমিদা ইসলাম। তখনকার দিনে অনেকেই বিষয়টিকে গুরুত্ব দেননি। কিন্তু তিনি জানতেন, এই ক্ষুদ্র প্রয়াস একদিন বড় কিছুতে রূপ নিতে পারে।

আজ সেই ছোট্ট উদ্যোগটি রূপ নিয়েছে এক সামাজিক আন্দোলনে। ৭০০-৮০০ জন নারী ইতোমধ্যেই এখান থেকে সেলাই প্রশিক্ষণ নিয়ে স্বাবলম্বী হয়েছেন। কেউ টেইলারিং দোকান খুলেছেন, কেউ ঘরে বসে অর্ডার নিচ্ছেন, কেউ আবার ফেসবুক পেজে পোশাক বিক্রি করছেন।

সীমা পেরোনো সংগ্রাম

তাহমিদা ইসলাম শুধু শহরে বসেই প্রশিক্ষণ দেন না। নিজেই পৌঁছে যান নেত্রকোনার প্রত্যন্ত গ্রাম-গঞ্জে। খুঁজে বের করেন সেই নারীদের, যারা জীবনের নানা বাধায় থেমে গেছেন-বিধবা, স্বামী-পরিত্যক্তা বা দরিদ্র গৃহবধূ।

তাদের শেখান হাতে-কলমে-ব্লাউজ, পেটিকোট, থ্রি-পিস, শিশুদের জামা কাপড় তৈরির কৌশল। পাশাপাশি দেন পণ্য বিক্রির কৌশল, ব্যবসা শুরুর পরামর্শ, আর সবচেয়ে বড় কথা-জীবন বদলে দেওয়ার সাহস।

“সেলাই শিখে কী হবে?” এখন সময় বদলেছে

“আগে অনেকে বলত, সেলাই শিখে কী হবে? এখন তারাই এসে বলে, ভালো করেছো এই কাজ শুরু করেছো,”-বলছিলেন তাহমিদা ইসলাম এক গাল হাসি দিয়ে।

বর্তমানে তিনি যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের অস্থায়ী প্রশিক্ষক হিসেবেও কাজ করছেন। তার এই সরকারি স্বীকৃতি যেন তার প্রয়াসের প্রতি সমাজের আনুষ্ঠানিক সম্মান।

প্রতিদিনের দৃশ্য: আশার মুখ

‘স্বপ্নবুনন’-এ প্রতিদিন আসে ৫০-৬০ জন নারী। কেউ স্কুলপড়ুয়া কিশোরী, কেউ নববিবাহিতা, কেউ আবার সংসারের ভার কাঁধে নেওয়া এক মা।
তারা এখানে কেবল সেলাই শিখেন না-শিখেন আত্মবিশ্বাস, শিখেন নিজের পায়ে দাঁড়ানোর মানে।

অনেকে এখন পরিবারে মূল উপার্জনকারী। সন্তানদের স্কুলে পাঠাচ্ছেন, সংসার চালাচ্ছেন, এমনকি অন্য নারীদেরও উৎসাহ দিচ্ছেন।

নারীবিপ্লবের নীরব সূচনা

এই কেন্দ্রটি এখন আর কেবল একটি সেলাই প্রশিক্ষণ কেন্দ্র নয়-এটি এক নীরব নারীবিপ্লবের জন্মস্থান।
তাহমিদা ইসলামের হাতে গড়া ‘স্বপ্নবুনন’ বদলে দিচ্ছে নেত্রকোনার সামাজিক চিত্র। তিনি যেন এক আলোকবর্তিকা, যিনি অন্যদের জীবন আলোকিত করতে নিজের জীবন উৎসর্গ করেছেন।

ভবিষ্যতের দিকে চাওয়া

তাহমিদা ইসলাম চান, এই প্রশিক্ষণ মডেল ছড়িয়ে পড়ুক আরও উপজেলায়, আরও জেলায়। প্রয়োজন শুধু একটু সহযোগিতা, সামান্য স্বীকৃতি।
তাহলেই ‘স্বপ্নবুনন’ হতে পারে সারাদেশে নারীদের আত্মনির্ভরতার বাতিঘর।

শেষ কথায়…

স্বপ্ন শুধু চোখে দেখার জিনিস নয়, কেউ কেউ তা হাতে ধরিয়ে দেয়। তাহমিদা ইসলাম তেমনই একজন-যার হাতে সূঁচ-সূতা, মনে সাহস আর হৃদয়ে নারীদের জন্য সীমাহীন ভালোবাসা।

an adbox will go here