স্রেব্রেনিৎসা থেকে গাজা: জাতিসংঘ ‘নিরাপদ’ বললেও গণহত্যা থেমে নেই - দিগন্ত জার্নাল

স্রেব্রেনিৎসা থেকে গাজা: জাতিসংঘ ‘নিরাপদ’ বললেও গণহত্যা থেমে নেই

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:

রবিবার, ১৩ জুলাই ২০২৫ | “আমি ১৯৯০-এর দশকের যুদ্ধে জাতিসংঘ ঘোষিত ‘নিরাপদ অঞ্চল’ স্রেব্রেনিৎসায় অবরুদ্ধ অবস্থায় বেঁচে ছিলাম। আজ, ৩০ বছর পর ফিলিস্তিনিদের বলা হচ্ছে সেই একই ভাঙা প্রতিশ্রুতিতে বিশ্বাস রাখতে।” — এমনই হৃদয়বিদারক অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিয়েছেন লেখিকা ও মানবাধিকার কর্মী নিজারা আহমেতাসেভিচ।

২০০৩ সালের ১১ জুলাই, বসনিয়ার সারায়েভো শহরের রাজপথে ঝুলে পড়া বিশাল একটি পোস্টারে এক তরুণী ক্যামেরার দিকে সোজা তাকিয়ে ছিল। পোস্টারের নিচে ছিল বিবরণ—”দাঁত নেই…? গোঁফ…? মলের গন্ধ…? বসনিয়ান মেয়ে!”—১৯৯৪/৯৫ সালে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী বাহিনীর ব্যারাকে এক ডাচ সেনার লেখা এই অপমানজনক বার্তাটিই ছিল যুদ্ধাপরাধের নীরব দর্শকের প্রমাণ। শিল্পী সেইলা কামেরিচ এটি তৈরি করেন আলোকচিত্রী তারিক সামারাহ-র তোলা ছবির ভিত্তিতে।

স্রেব্রেনিৎসায় জাতিসংঘ ব্যর্থ হয়েছিল

১৯৯৫ সালের ৩ জুলাই স্রেব্রেনিৎসায় প্রবেশ করে সার্বীয় বাহিনী। তিন বছরের অবরোধ শেষে হাজার হাজার মানুষ জাতিসংঘের ঘাঁটির দিকে ছুটে যায় আশ্রয়ের আশায়। কিন্তু ১১ জুলাইয়ের মধ্যেই সেখান থেকে আলাদা করে নেয়া হয় পুরুষদের—এবং ৮,০০০-এর বেশি পুরুষকে হত্যা করা হয়। এ ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপে সবচেয়ে বড় গণহত্যা।

যদিও জাতিসংঘ শান্তিরক্ষীরা ঘাঁটির ভেতরেই উপস্থিত ছিল, তারা কোনো প্রতিরোধ গড়ে তোলে না। বরং তাদের প্রধান উদ্বেগ ছিল—নিজেদের নিরাপত্তা

গাজাতেও কি সেই একই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি?

তিন দশক পর, গাজায় যখন জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী বাহিনী পাঠানোর দাবি উঠছে, তখন নিজারা বলেন—“জাতিসংঘের নাম শুনলেই আমার মনে পড়ে প্রতারণা, ব্যর্থতা ও বিশ্বাসঘাতকতার ইতিহাস।”

তিনি দাবি করেন, শান্তিরক্ষীদের উপস্থিতি বরং আসল সমস্যাকে আড়াল করে। এটি যেন দু’টি সমান শক্তির পক্ষের যুদ্ধ—এমন ভ্রান্ত ধারণা তৈরি করে। অথচ গাজায় চলছে একতরফা দখল, গণহত্যা ও বর্ণবাদী সহিংসতা।

‘নিরাপদ এলাকা’—নাকি আন্তর্জাতিকভাবে অনুমোদিত নির্যাতনক্ষেত্র?

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ১৯৯৫ সালের এক রিপোর্টে জানিয়েছিল, স্রেব্রেনিৎসা ‘নিরাপদ এলাকা’ হলেও তা বাস্তবে ছিল “জাতিসংঘ পরিচালিত জাতিগত নিধন ক্ষেত্র”। ডাচ সরকার ও জাতিসংঘ দীর্ঘদিন ওই গণহত্যার দায় এড়াতে চেয়েছে। ২০১৯ সালে নেদারল্যান্ডসের সুপ্রিম কোর্ট ডাচ বাহিনীর মাত্র ১০% দায় স্বীকার করেছে।

গাজায় সমাধান কোথায়?

নিজারার মতে, “শান্তিরক্ষী পাঠানো সমাধান নয়। সমাধান হতে হবে ভুক্তভোগীদের নিজস্ব অভিজ্ঞতা ও নেতৃত্বে।” তিনি বলেন, “যতক্ষণ না সম্পূর্ণ যুদ্ধবিরতি হয়, ততক্ষণ কোনো শান্তি উদ্যোগ কার্যকর হবে না।”

৩০ বছর আগের স্রেব্রেনিৎসা ও আজকের গাজা—দুই ভিন্ন ভৌগোলিক বাস্তবতা হলেও বাস্তব অভিজ্ঞতা একটিই: আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ব্যর্থতা। জাতিসংঘের ঘোষিত ‘নিরাপদ’ এলাকা কতটা নিরাপদ, তা প্রমাণিত হয়েছে ইতিহাসে বারবার। গাজাও কি তবে সেই পুরোনো ইতিহাসেরই আধুনিক অনুলিপি?

সূত্র: মিডল ইস্ট আই-এ প্রকাশিত নিজারা আহমেতাসেভিচের লেখা অবলম্বনে প্রস্তুত। প্রকাশনায়: দিগন্ত জার্নাল | সাম্যের আহ্বানে

an adbox will go here