বৃষ্টিতে তলিয়ে গেল রাজধানীর অলিগলি, জলাবদ্ধতায় স্থবির নগরজীবন
শনিবার, ১ নভেম্বর ২০২৫
ঢাকা | শনিবার বিকেল থেকে শুরু হওয়া টানা বৃষ্টিতে রাজধানী ঢাকার অধিকাংশ অলিগলি পানিতে তলিয়ে গেছে। বিকেল থেকে প্রায় আড়াই ঘণ্টা প্রবল বর্ষণে নগরীর বিভিন্ন এলাকা কার্যত অচল হয়ে পড়ে। অফিসফেরত মানুষ পড়েছে চরম দুর্ভোগে। যানজট, পানি জমে থাকা রাস্তা, বন্ধ দোকানপাট—সব মিলিয়ে শহরের চিরচেনা ব্যস্ততা এক নিমিষে থেমে যায়।
বিকেল চারটার দিকে ঢাকার আকাশ কালো মেঘে ঢেকে গেলে কিছুক্ষণের মধ্যেই শুরু হয় গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি। বিকেল পাঁচটার পর তা প্রবল বর্ষণে রূপ নেয়। রাত সাড়ে সাতটার দিকে বৃষ্টি কমতে শুরু করলেও ততক্ষণে গুলশান, বনানী, বসুন্ধরা, শাহজাদপুর, নতুনবাজার, নদ্দা, মহাখালী, মগবাজার, পুরানা পল্টন, শান্তিনগর ও মিরপুরসহ বহু এলাকায় হাঁটুপানি জমে যায়।
এমনকি যমুনা ফিউচার পার্ক, পুলিশ প্লাজা ও নদ্দা মার্কেট এলাকায় দোকানপাটে পানি ঢুকে পড়ে। এতে ব্যবসায়ীরাও বিপাকে পড়েন। নগরজুড়ে রিকশা ও অটোরিকশার ভাড়া দ্বিগুণ বেড়ে যায়। অফিসফেরত যাত্রীরা এক প্রকার বাধ্য হয়েই অতিরিক্ত ভাড়া দিয়ে ঘরে ফিরেছেন।
রিকশাচালক মজিবর মিয়া বলেন, “পানি উঠলে রিকশা ঠেলে চালাতে হয়, কষ্ট হয় অনেক। তাই একটু বেশি ভাড়া নিতে হয়। কিন্তু আমরাও তো কাজ না করলে খেতে পারি না।”
শাহজাদপুরের গৃহবধূ রুবিনা পারভীন বলেন, “বৃষ্টি নামলেই রাস্তায় হাঁটা যায় না। বাচ্চাদের স্কুলে নেওয়া কষ্টকর হয়ে পড়ে। প্রশাসন দেখেও কিছু করে না।”
আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, দক্ষিণ ছত্তিশগড় ও সংলগ্ন এলাকায় সৃষ্ট লঘুচাপ দুর্বল হয়ে পশ্চিমবঙ্গে অবস্থান করছে। তবে আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে পূর্ব-মধ্য বঙ্গোপসাগরে নতুন একটি লঘুচাপ সৃষ্টি হতে পারে, যা বাংলাদেশের আবহাওয়ায় প্রভাব ফেলবে।
প্রতিষ্ঠানটির পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, রংপুর, রাজশাহী, ময়মনসিংহ, ঢাকা, খুলনা ও সিলেট বিভাগের অনেক স্থানে হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টি অব্যাহত থাকতে পারে। কোথাও কোথাও ভারি থেকে অতিভারি বৃষ্টিও হতে পারে।
আবহাওয়াবিদ মো. বজলুর রশিদ বলেন, “বর্তমানে বঙ্গোপসাগরে আর্দ্রতা বেশি। তাই এই বৃষ্টি আরও কয়েকদিন থাকতে পারে। নভেম্বরের শুরুতে এমন বৃষ্টিপাত অস্বাভাবিক নয়, তবে নগর প্রস্তুতি না থাকায় জলাবদ্ধতা ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে।”
নগর পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, ঢাকায় জলাবদ্ধতা কোনো নতুন সমস্যা নয়, বরং বহু বছরের অব্যবস্থাপনা ও পরিকল্পনার ঘাটতির ফল। রাজধানীতে ড্রেনেজ নেটওয়ার্ক অপ্রতুল, অপরিকল্পিতভাবে উঁচু ভবন ও সড়ক নির্মাণের ফলে পানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সাবেক প্রকৌশলী মো. হাফিজুল ইসলাম বলেন, “ঢাকায় যে পরিমাণ ড্রেন রয়েছে, তার প্রায় অর্ধেকই কার্যকর নয়। অনেক ড্রেন দখল হয়ে গেছে, আবার অনেক জায়গায় ড্রেনের সংযোগই সঠিকভাবে নেই।”
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা জানান, চলতি বছর ২৭টি স্পটে জলাবদ্ধতা রোধে কার্যক্রম নেওয়া হলেও পর্যাপ্ত নালা সংস্কার হয়নি। ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই রাস্তায় পানি জমে যাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জলাবদ্ধতার মূল কারণ হলো—প্রাকৃতিক জলাধার ও খালের দখল, অপর্যাপ্ত ড্রেনেজ নেটওয়ার্ক এবং ভূমি ব্যবস্থাপনায় সমন্বয়হীনতা।
বৃষ্টির কারণে ঢাকায় যানবাহন চলাচল কার্যত থমকে যায়। রাজধানীর প্রধান সড়কগুলোয় কয়েক ঘণ্টার যানজটে আটকে থাকে হাজারো যাত্রী। অফিসফেরত মানুষ, শিক্ষার্থী ও কর্মজীবী নারীরা চরম ভোগান্তির শিকার হন।
নগরবাসীর অনেকে অভিযোগ করেছেন, বৃষ্টির সময় করপোরেশনের ফায়ার সার্ভিস বা ওয়াসার কার্যকর উপস্থিতি দেখা যায়নি।
ধানমন্ডির বাসিন্দা সুমনা রহমান বলেন, “প্রতিবার বৃষ্টির সময় এই একই দৃশ্য। কয়েক ঘণ্টা বৃষ্টি হলেই রাস্তায় পানি। উন্নয়নের এত কাজ হচ্ছে, কিন্তু সমস্যার জায়গাটা রয়ে গেছে একই।”
অনেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঢাকার বৃষ্টিপ্লাবিত ছবি ও ভিডিও পোস্ট করেছেন। কেউ লিখেছেন, “এটা ঢাকা না, ভেনিস।” কেউ আবার লিখেছেন, “আমরা এখন ওয়াটার সিটি ঢাকায় থাকি।”
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আতিকুল ইসলাম এক বিবৃতিতে বলেন, “আমরা ইতিমধ্যে জলাবদ্ধতা রোধে একাধিক প্রকল্প হাতে নিয়েছি। কিছু এলাকায় পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা উন্নত করা হয়েছে। তবে দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।”
তিনি আরও জানান, বৃষ্টির সময় তাৎক্ষণিক পানি সরানোর জন্য পাম্প ব্যবহারের পাশাপাশি নতুন ড্রেন নির্মাণ ও পুরনো ড্রেন সংস্কার চলছে।
ঢাকা ওয়াসার এক কর্মকর্তা বলেন, “আমরা বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনে সিটি করপোরেশনের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করছি। তবে নাগরিক সচেতনতা ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনাও গুরুত্বপূর্ণ। অনেকেই ড্রেনে পলিথিন ফেলায় পানি চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।”
নগরবিদ ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, জলাবদ্ধতার সমাধানে স্বল্পমেয়াদি পাম্পিং নয়, প্রয়োজন সুদূরপ্রসারী নগর পরিকল্পনা।
তাদের মতে, রাজধানীর প্রাকৃতিক খাল পুনরুদ্ধার, আধুনিক ড্রেনেজ নেটওয়ার্ক, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ এবং সুনির্দিষ্ট ‘ওয়াটার রাউট’ নির্ধারণ ছাড়া কোনো পরিকল্পনা টেকসই হবে না।
পরিবেশবিদ সুলতানা কামাল বলেন, “আমরা উন্নয়নের নামে জলাধার ভরাট করে নিজেদের ভবিষ্যৎ বিপন্ন করছি। এখনই যদি কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, ঢাকার জলাবদ্ধতা একদিন স্থায়ী বিপর্যয়ে পরিণত হবে।”
ঢাকা আজ আধুনিক নগরীর স্বপ্ন দেখলেও, একটানা কয়েক ঘণ্টার বৃষ্টি সেই স্বপ্নে ফাটল ধরিয়ে দেয়। নাগরিকদের প্রত্যাশা—একটি এমন ঢাকা, যেখানে কয়েক ঘণ্টার বৃষ্টিতে শহর আর থেমে যাবে না, অফিসফেরত মানুষ আর জলমগ্ন রাস্তায় আটকে থাকবে না।
দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, সমন্বিত বাস্তবায়ন ও সচেতন নাগরিক অংশগ্রহণই পারে জলাবদ্ধ রাজধানীকে আবার প্রাণবন্ত করে তুলতে।