জাতীয় নির্বাচন ঘিরে নাশকতার আশঙ্কা: নির্বাচন কমিশন
নির্বাচন ঘিরে নাশকতার আশঙ্কা: ৪২ হাজার ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ২৮ হাজারই ঝুঁকিপূর্ণ
ঢাকা | দিগন্ত জার্নাল | জাতীয় | ১০ নবেম্বর ২০২৫
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে নাশকতা ও অস্থিতিশীল পরিস্থিতির আশঙ্কা প্রকাশ করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, সশস্ত্র বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে ইসি জানিয়েছে—নির্বাচনের আগে ও চলাকালীন সময়ে দেশে গুজব, সহিংসতা, অস্ত্র সরবরাহ এবং তথ্যপ্রযুক্তি অপব্যবহারসহ বিভিন্ন ধরনের “স্যাবোটাজ” ঘটতে পারে।
ইসি সূত্রে জানা গেছে, সারা দেশের ৪২ হাজার ভোটকেন্দ্রের মধ্যে প্রায় ২৮ হাজার ৬৬৩টি কেন্দ্রকে “ঝুঁকিপূর্ণ” হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব কেন্দ্রের অধিকাংশই রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও অতীত সহিংসতার কারণে ঝুঁকির তালিকায় এসেছে।
নির্বাচন কমিশনের তত্ত্বাবধানে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে সশস্ত্র বাহিনী, র্যাব, পুলিশ, বিজিবি, গোয়েন্দা সংস্থা ও সাইবার ইউনিটের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। ওই বৈঠকের কার্যবিবরণীতে উঠে আসে, ভোটের আগে “অবৈধ অস্ত্রের জোগান” আসতে পারে এবং নির্বাচনে “এআই ও সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করে গুজব” ছড়ানো হতে পারে।
ডিজিএফআইয়ের প্রধান বৈঠকে বলেন, “গুজব ও বিভ্রান্তি ছড়ানোই হবে এবারের নির্বাচনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি মিথ্যা ছবি ও ভয়েস ক্লোনের মাধ্যমে প্রার্থীদের মানহানি বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা হতে পারে।”
এদিকে, সিআইডি প্রধান জানান, ইতোমধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একাধিক বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট শনাক্ত করা হয়েছে। এসব গুজব ঠেকাতে র্যাবের সাইবার ইউনিট সক্রিয়ভাবে কাজ করছে।
নির্বাচন কমিশনের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ জানান, “নাশকতার আশঙ্কা আছে। তথ্যপ্রযুক্তির অপব্যবহার করে পরিস্থিতি ঘোলাটে করার আশঙ্কাও রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে আরও কয়েক দফা বৈঠকে বিস্তারিত নিরাপত্তা পরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হবে।”
ইসির পক্ষ থেকে জানানো হয়, ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা এবং ফেব্রুয়ারির ১২ তারিখের মধ্যে ভোটগ্রহণের পরিকল্পনা রয়েছে। সে অনুযায়ী, নভেম্বর মাসে সারাদেশে নিরাপত্তা জোন চিহ্নিত করে রেড, ইয়োলো ও গ্রিন ক্যাটাগরিতে ভাগ করা হবে।
প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ. এম. এম. নাসির উদ্দিন বলেছেন, “অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন আয়োজনই ইসির প্রধান লক্ষ্য। এজন্য প্রতিটি বাহিনীর সঙ্গে সমন্বিত পরিকল্পনা তৈরি করা হচ্ছে।”
ইসি সূত্রে জানা গেছে, সম্প্রতি প্রাথমিক সহকারী শিক্ষক ও নন-এমপিও শিক্ষকদের আন্দোলন নিয়ে কমিশন উদ্বিগ্ন। কারণ এই দুই শ্রেণির শিক্ষকই ভোটের দিন দায়িত্ব পালন করবেন। আন্দোলনের কারণে তাদের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি হলে তা ভোটের পরিবেশকে প্রভাবিত করতে পারে বলে আশঙ্কা করছে কমিশন।
রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে “জুলাই সনদ” ও গণভোট ইস্যু নিয়ে বিরোধ, এবং “আমজনতার দল”-এর নিবন্ধন না পাওয়ায় নির্বাচন কমিশনের সামনে ধারাবাহিক অবস্থানও কমিশনকে বিব্রত করছে। ইসির একজন কমিশনার বলেন, “রাজনৈতিক পরিবেশ ক্রমেই উত্তপ্ত হচ্ছে। যে কোনো অজুহাতে সংঘর্ষ বা হামলার ঝুঁকি রয়েছে।”
বৈঠকে সেনাবাহিনী প্রধানের প্রতিনিধি বলেন, নির্বাচনে সেনাবাহিনীকে বিচারিক ক্ষমতা দেওয়া হলে তাদের কার্যক্রম আরও কার্যকর হবে। তিনি ভোটগ্রহণ ও নির্বাচনি সামগ্রী রক্ষায় সেনাবাহিনীকে ভোটকেন্দ্রে প্রবেশের অনুমতির প্রয়োজনীয়তার কথাও উল্লেখ করেন।
অন্যদিকে আনসার ও ভিডিপির মহাপরিচালক বলেন, “রাজনৈতিক সম্পৃক্ত আনসার সদস্যদের এ নির্বাচনে দায়িত্ব দেওয়া হবে না।” তিনি এবারের নির্বাচনকে “সম্পূর্ণ ভিন্ন ও ঝুঁকিপূর্ণ প্রেক্ষাপটের” বলে অভিহিত করেন।
২২ দফা সিদ্ধান্তে কঠোর অবস্থান
বৈঠকের কার্যবিবরণীতে উল্লেখ আছে, মোট ২২টি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি হলো:
- নাশকতা প্রতিরোধে সর্বস্তরে সতর্কতা বৃদ্ধি।
- রেড, ইয়োলো ও গ্রিন জোনভিত্তিক নিরাপত্তা পরিকল্পনা তৈরি।
- নির্বাচনি কর্মকর্তাদের বাসস্থান ও কার্যালয়ের নিরাপত্তা জোরদার।
- গুজব ও বিভ্রান্তি প্রতিরোধে ডিজিটাল মনিটরিং সেল গঠন।
- অবৈধ অস্ত্র ও অর্থের প্রবাহ রোধে গোয়েন্দা কার্যক্রম বাড়ানো।
বিশ্লেষকদের মতে, এবারের নির্বাচন শুধু রাজনৈতিক নয়, প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জেও ভরপুর। একদিকে মাঠপর্যায়ে নিরাপত্তা, অন্যদিকে অনলাইন স্পেসে তথ্যযুদ্ধ—দুই দিকেই তদারকি প্রয়োজন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মাহবুব হাসান দিগন্ত জার্নালকে বলেন, “যদি সাইবার নিরাপত্তা এবং মাঠ পর্যায়ের আইনশৃঙ্খলা সঠিকভাবে সমন্বিত না হয়, তাহলে একটি ছোট গুজবও বড় সহিংসতার জন্ম দিতে পারে।”
নির্বাচন কমিশন এখন সব পক্ষের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সমন্বয় করে একটি “ঝুঁকি-নিরপেক্ষ” নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। কমিশন বলছে, জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধারই তাদের প্রধান লক্ষ্য।
অবাধ, সুষ্ঠু ও সহিংসতামুক্ত নির্বাচনের প্রত্যাশা এখন গোটা জাতির।