ঢাকায় চীনের প্রভাব মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রের দৌড়ঝাপ - দিগন্ত জার্নাল

ঢাকায় চীনের প্রভাব মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রের দৌড়ঝাপ

বাংলাদেশ, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, প্রতিরক্ষা সামগ্রী, ওয়াশিংটন, বেইজিং, দক্ষিণ এশিয়া, নির্বাচন, রয়টার্স

অনলাইন ডেস্ক । আন্তর্জাতিক । বুধবার ,১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

ঢাকা: দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এই উদ্বেগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে বাংলাদেশ। ঢাকায় চীনা কূটনীতিক ও কর্মকর্তাদের সক্রিয় উপস্থিতি ওয়াশিংটনের কৌশলগত হিসাব-নিকাশে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের নবনির্বাচিত সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করতে চায় যুক্তরাষ্ট্র। চীনের সামরিক ও প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের বিকল্প হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সরবরাহের পরিকল্পনা করছে ওয়াশিংটন। এমন তথ্য জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।

বাংলাদেশকে ঘিরে চীন-যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত প্রতিযোগিতা

বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশ এখন দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে। ভারত মহাসাগর, বঙ্গোপসাগর এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থলে অবস্থানের কারণে এই অঞ্চলটি চীন ও যুক্তরাষ্ট্র—উভয়ের কাছেই কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

ঢাকায় সাম্প্রতিক সময়ে বেইজিংয়ের কূটনৈতিক তৎপরতা এবং প্রতিরক্ষা সহযোগিতা যুক্তরাষ্ট্রকে নতুন করে চিন্তায় ফেলেছে।

রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সুযোগ নিচ্ছে বেইজিং

২০২৪ সালের আগস্টে জেন-জি নেতৃত্বাধীন অভ্যুত্থানে ভারতপন্থি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় বড় পরিবর্তন আসে। বর্তমানে তিনি ভারতে অবস্থান করছেন।

এর ফলে বাংলাদেশে ভারতের প্রভাব তুলনামূলকভাবে কমেছে বলে মনে করছেন কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকরা। এই শূন্যস্থানকে কাজে লাগিয়ে চীন দ্রুত তাদের প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে।

সীমান্তের কাছে ড্রোন কারখানা উদ্বেগ বাড়াচ্ছে

সম্প্রতি চীন বাংলাদেশের সঙ্গে একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। এই চুক্তির আওতায় ভারত সীমান্তের কাছাকাছি একটি ড্রোন কারখানা স্থাপনের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে

এই উদ্যোগ বিদেশি কূটনীতিকদের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। কারণ, এটি শুধু প্রতিরক্ষা নয়, আঞ্চলিক নিরাপত্তা ভারসাম্যেও প্রভাব ফেলতে পারে।

যুদ্ধবিমান কেনার আলোচনাও নজরে ওয়াশিংটনের

বাংলাদেশের সঙ্গে পাকিস্তানের সামরিক আলোচনা নিয়েও সতর্ক দৃষ্টি রাখছে যুক্তরাষ্ট্র।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশ পাকিস্তান ও চীনের যৌথভাবে তৈরি জেএফ-১৭ থান্ডার মাল্টিরোল যুদ্ধবিমান কেনার বিষয়ে আলোচনা করছে

এই যুদ্ধবিমান ইতোমধ্যে পাকিস্তান বিমান বাহিনীতে ব্যবহৃত হচ্ছে এবং এটি চীনা প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা প্রস্তাব কী?

ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্রের কৌশল হলো—

  • চীনা প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের ঝুঁকি তুলে ধরা
  • স্বচ্ছ ও দীর্ঘমেয়াদি বিকল্প প্রতিরক্ষা সহযোগিতা প্রস্তাব করা
  • ন্যাটো-সমর্থিত বা মিত্র দেশগুলোর প্রযুক্তি সামনে আনা

যুক্তরাষ্ট্র চায়, বাংলাদেশ যেন প্রতিরক্ষা খাতে এককভাবে চীনের ওপর নির্ভরশীল না হয়।

মার্কিন রাষ্ট্রদূতের বক্তব্য

গত মঙ্গলবার দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি. ক্রিস্টেনসেন বলেন,

“দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। আমরা বাংলাদেশের সঙ্গে নিবিড়ভাবে কাজ করতে চাই, যাতে চীনের সঙ্গে কিছু চুক্তির সম্ভাব্য ঝুঁকি স্পষ্টভাবে তুলে ধরা যায়।”

তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা অংশীদারিত্ব গড়ে তুলতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

নির্বাচন সামনে রেখে কূটনৈতিক তৎপরতা

এমন এক সময় এই কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়ছে, যখন বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) বাংলাদেশে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, নির্বাচনের পর নতুন সরকার গঠিত হলে যুক্তরাষ্ট্র দ্রুত কূটনৈতিক ও প্রতিরক্ষা আলোচনায় গতি আনতে পারে।

বাংলাদেশ কী করবে?

বাংলাদেশ ঐতিহ্যগতভাবে “সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়”—এই নীতিতে চলে। তবে বর্তমান ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় ভারসাম্য রক্ষা করা সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।

একদিকে চীনের অর্থনৈতিক ও সামরিক সহায়তা, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত ও নিরাপত্তা প্রস্তাব—এই দুইয়ের মধ্যে সিদ্ধান্ত নিতে হবে ঢাকাকে।

দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে নতুন অধ্যায়

বাংলাদেশকে কেন্দ্র করে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের এই প্রতিযোগিতা দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করছে। বিশ্লেষকদের মতে, আগামী কয়েক মাসে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা নীতিতে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসতে পারে।

এই পরিবর্তন শুধু বাংলাদেশ নয়, পুরো অঞ্চলের শক্তির ভারসাম্যকেই প্রভাবিত করবে।

Home » আন্তর্জাতিক রাজনীতি
an adbox will go here