জনগণের নিরাপত্তা ফিরিয়ে আনাই সরকারের অগ্রাধিকার: প্রধানমন্ত্রী
নিজস্ব প্রতিবেদক । জাতীয় । বৃহস্পতিবার, ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
জনগণের মনে শান্তি ও নিরাপত্তা ফিরিয়ে আনাই সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার: প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে জনগণের মনে শান্তি ও নিরাপত্তা ফিরিয়ে আনাই নবগঠিত সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার—এমন প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
বুধবার (১৮ ফেব্রুয়ারি) রাতে বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বাংলাদেশ বেতার-এ একযোগে সম্প্রচারিত জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে তিনি এ কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণের পর এটিই ছিল তার প্রথম জাতির উদ্দেশে ভাষণ।
নতুন সরকারের যাত্রা ও অঙ্গীকার
ভাষণের শুরুতেই প্রধানমন্ত্রী মহান আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া আদায় করেন এবং বলেন, দীর্ঘ সংগ্রাম ও ত্যাগের বিনিময়ে জনগণের ভোটে একটি জবাবদিহিমূলক সরকার গঠিত হয়েছে। তিনি বলেন, এই সরকার গণতন্ত্র, আইনের শাসন এবং নাগরিক অধিকারের পুনঃপ্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কাজ করবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, “দল-মত, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে পাহাড়ে বা সমতলে বসবাসকারী—এই দেশ আমাদের সবার। প্রতিটি নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই সরকারের মূল দায়িত্ব।” তিনি আরও বলেন, একটি মানবিক, নিরাপদ ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়াই বর্তমান সরকারের লক্ষ্য।
আইনশৃঙ্খলা ও দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান
তারেক রহমান বলেন, দীর্ঘদিনের দুঃশাসনের ফলে দেশ একটি ভঙ্গুর অর্থনীতি, দুর্বল প্রশাসনিক কাঠামো এবং অবনতিশীল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এই বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে সরকার সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন ও দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে।
তিনি বলেন, জুয়া ও মাদক সমাজে অপরাধ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। তাই এসব অপরাধ দমনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সরকার কোনো ধরনের রাজনৈতিক প্রভাব বা জোরজবরদস্তিকে প্রশ্রয় দেবে না বলেও তিনি স্পষ্ট করেন।
“আইনের শাসনই হবে রাষ্ট্র পরিচালনার শেষ কথা”—এমন মন্তব্য করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকারি ও বেসরকারি সব প্রতিষ্ঠান নির্ধারিত নীতিমালা অনুযায়ী পরিচালিত হবে।
রমজান মাসে বাজার ও সেবা ব্যবস্থাপনা
আগামী দিন থেকে পবিত্র রমজান মাস শুরু হওয়ার প্রেক্ষাপটে দেশবাসীকে শুভেচ্ছা জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, রমজান আত্মশুদ্ধির মাস—এই মাসে মানুষের কষ্ট বাড়ানো অনৈতিক।
ব্যবসায়ীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, “রমজানকে অতিরিক্ত মুনাফার মাস হিসেবে বিবেচনা করবেন না।” দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে সরকার কঠোর অবস্থানে থাকবে বলেও জানান তিনি।
রমজান মাসে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির সরবরাহ নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে ভাষণে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী।
কৃচ্ছ্রতা ও দৃষ্টান্ত স্থাপন
সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে কৃচ্ছ্রতার দৃষ্টান্ত স্থাপনের কথা উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, বিএনপি থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা করমুক্ত গাড়ি আমদানি ও প্লট সুবিধা গ্রহণ করবেন না—এ সিদ্ধান্ত ইতোমধ্যে নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, রাষ্ট্র পরিচালনায় মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর ন্যায়পরায়ণতার আদর্শ অনুসরণ করাই বিএনপি সরকারের লক্ষ্য।
যানজট ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন
প্রধানমন্ত্রী রাজধানী ঢাকাসহ বিভাগীয় শহরগুলোর যানজটকে বড় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেন। তিনি বলেন, জনদুর্ভোগ কমাতে বিকেন্দ্রীকরণ জরুরি।
এ লক্ষ্যেই রেল যোগাযোগ ব্যবস্থাকে আধুনিক ও সহজলভ্য করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। রেল, নৌ ও সড়ক ব্যবস্থার মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো হবে বলে তিনি জানান। এর ফলে একদিকে নগরকেন্দ্রিক চাপ কমবে, অন্যদিকে পরিবেশের উন্নয়ন ঘটবে বলেও আশা প্রকাশ করেন।
তরুণ সমাজ ও কর্মসংস্থান
দেশের তরুণ সমাজকে ভবিষ্যতের শক্তি উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তরিত হতে পারলে বাংলাদেশের জন্য বিশ্ববাজার উন্মুক্ত হবে।
তিনি বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও তথ্যপ্রযুক্তির যুগে টিকে থাকতে হলে তরুণদের দক্ষতা অর্জনের বিকল্প নেই। এ ক্ষেত্রে সরকার সর্বোচ্চ সহায়তা দেবে এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করবে।
রাজনৈতিক সহনশীলতা ও সমান অধিকার
ভাষণের শেষাংশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, যারা বিএনপিকে ভোট দিয়েছেন বা দেননি—এই সরকারের প্রতি সবার অধিকার সমান। বিএনপি সরকার বিশ্বাস করে, “রাষ্ট্র সবার”।
তিনি বলেন, “একজন বাংলাদেশি হিসেবে প্রতিটি নাগরিকের অধিকার সমান—এটাই আমাদের রাজনৈতিক দর্শন।”
আশাবাদ ও প্রত্যাশা
প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যের শেষাংশে দেশবাসীর অব্যাহত সমর্থন কামনা করেন এবং বলেন, নির্বাচনের আগে দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের কাজ ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে।
তিনি আল্লাহর কাছে দেশ ও জাতির কল্যাণ কামনা করে বলেন, “আল্লাহ আমাদের সবাইকে নিরাপদ ও সুস্থ রাখুন এবং দেশ গঠনের এই যাত্রায় সফলতা দিন।”