গঙ্গা চুক্তির মেয়াদ শেষ, কূটনৈতিক চাপে বাংলাদেশ-ভারত - দিগন্ত জার্নাল

গঙ্গা চুক্তির মেয়াদ শেষ, কূটনৈতিক চাপে বাংলাদেশ-ভারত

গঙ্গা, পানি, চুক্তি, ফারাক্কা, ব্যারাজ, ভারত বাংলাদেশ, সম্পর্ক, পানি, কূটনীতি, গঙ্গা, নবায়ন, আঞ্চলিক, রাজনীতি, পশ্চিমবঙ্গ,

নিজস্ব প্রতিবেদক । জাতীয় । রোববার, ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

গঙ্গা পানি চুক্তি: নবায়ন নাকি পুনর্নির্ধারণ—দক্ষিণ এশিয়ার নতুন কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ

চলতি বছরের ডিসেম্বরে শেষ হচ্ছে ১৯৯৬ সালে স্বাক্ষরিত গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ। ৩০ বছর আগে এই চুক্তি বাংলাদেশ ও ভারতের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আঞ্চলিক বাস্তবতা বদলেছে। রাজনৈতিক ক্ষমতার পালাবদল, জলবায়ু পরিবর্তন, জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং কৌশলগত স্বার্থ—সব মিলিয়ে গঙ্গা ইস্যু এখন নতুন মোড়ে দাঁড়িয়ে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই চুক্তির নবায়ন শুধু পানিবণ্টনের বিষয় নয়। এটি এখন সার্বভৌমত্ব, আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য এবং দক্ষিণ এশিয়ার কূটনৈতিক ভবিষ্যতের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

বদলেছে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট

শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর বাংলাদেশে রাজনৈতিক ক্ষমতার সমীকরণ নতুনভাবে গড়ে উঠেছে। একই সঙ্গে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ধরনও পুনর্মূল্যায়নের পর্যায়ে এসেছে। দীর্ঘদিন ধরে পানি, বাণিজ্য, ট্রানজিট, বিদ্যুৎ ও নিরাপত্তার ওপর দাঁড়িয়ে থাকা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক এখন নতুন বাস্তবতায় প্রবেশ করেছে।

এই পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে গঙ্গা পানি চুক্তি একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত ইস্যু হয়ে উঠেছে। বিশ্লেষকদের অনেকেই মনে করছেন, উজানের দেশ হিসেবে ভারত চাইলে পানি চুক্তিকে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক লিভারেজ হিসেবে ব্যবহার করতে পারে।

ফারাক্কা ব্যারাজের কৌশলগত গুরুত্ব

গঙ্গা পানিবণ্টন বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ফারাক্কা ব্যারাজ। পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদে অবস্থিত এই ব্যারাজ বাংলাদেশের সীমান্ত থেকে মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরে। ১৯৭৫ সালে ব্যারাজটি চালু হওয়ার পর থেকেই দুই দেশের মধ্যে পানিবণ্টন নিয়ে টানাপোড়েন শুরু হয়।

বাংলাদেশের অভিযোগ, ফারাক্কা দিয়ে অতিরিক্ত পানি প্রত্যাহারের ফলে পদ্মা নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হচ্ছে। এতে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে লবণাক্ততা বাড়ছে, কৃষি উৎপাদন কমছে এবং নদীনির্ভর জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়ছে।

অন্যদিকে, ভারতের যুক্তি হলো—হুগলি নদীর নাব্য রক্ষা, কলকাতা বন্দর সচল রাখা এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য ফারাক্কার পানি অপরিহার্য।

১৯৯৬ সালের চুক্তির কাঠামো

১৯৯৬ সালের ১২ ডিসেম্বর নয়াদিল্লিতে তৎকালীন ভারতের প্রধানমন্ত্রী এইচ. ডি. দেবগৌড়া এবং বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ৩০ বছর মেয়াদি গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন।

চুক্তি অনুযায়ী, প্রতি বছর ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ মে পর্যন্ত শুষ্ক মৌসুমে ফারাক্কা পয়েন্টে পানিপ্রবাহের ভিত্তিতে তিন স্তরের একটি সূত্র নির্ধারণ করা হয়—

  • ৭০ হাজার কিউসেকের নিচে প্রবাহ হলে পানি সমান ভাগ
  • ৭০ থেকে ৭৫ হাজার কিউসেক হলে বাংলাদেশ পাবে ৩৫ হাজার কিউসেক
  • ৭৫ হাজার কিউসেকের বেশি হলে ভারত রাখবে ৪০ হাজার কিউসেক

এছাড়া মার্চ ১১ থেকে মে ১০ পর্যন্ত বিকল্প ১০ দিনের জন্য বাংলাদেশকে ৩৫ হাজার কিউসেক পানি দেওয়ার গ্যারান্টির ধারা যুক্ত ছিল।

এই চুক্তিকে তখন দুই দেশের মধ্যে আস্থার প্রতীক হিসেবে দেখা হয়েছিল।

বাস্তবতার সঙ্গে চুক্তির ফারাক

চুক্তি কার্যকর থাকলেও বাস্তবে বাংলাদেশ সব সময় নির্ধারিত পানিপ্রবাহ পায়নি—এমন অভিযোগ দীর্ঘদিনের। বিশেষ করে শুষ্ক মৌসুমে পানি সংকট প্রকট হয়ে ওঠে।

পরিবেশবিদদের মতে, পানির ঘাটতির কারণে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে লবণাক্ততা বৃদ্ধি পেয়েছে। মাছ উৎপাদন কমেছে। নৌচলাচল ব্যাহত হচ্ছে। বছরে প্রায় ২০ লাখ টন পলি জমে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

ভারতের অবস্থান ও নতুন বার্তা

সম্প্রতি ভারতের লোকসভায় দেশটির পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী কীর্তি বর্ধন সিং জানিয়েছেন, গঙ্গা পানি চুক্তির পুনঃনবায়ন নিয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু হয়নি। তিনি বলেন, বাংলাদেশে নতুন সরকার গঠনের পরই এ বিষয়ে আলোচনা হতে পারে।

এই সংক্ষিপ্ত বক্তব্যই দক্ষিণ এশিয়ার কূটনৈতিক অঙ্গনে বড় বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, ভারত সরাসরি নবায়নের বদলে চুক্তির শর্ত পুনর্বিবেচনা করতে আগ্রহী।

ভারতীয় গণমাধ্যমগুলোও ইঙ্গিত দিয়েছে, নতুন চুক্তি আগের মতো ৩০ বছরের দীর্ঘমেয়াদি নাও হতে পারে। ১০ থেকে ১৫ বছরের একটি কাঠামো নিয়ে আলোচনা হতে পারে।

পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি: একটি বড় ফ্যাক্টর

গঙ্গা চুক্তি নবায়নের ক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গের অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অতীতে আন্তঃদেশীয় পানি চুক্তিতে আপত্তি জানিয়েছেন।

২০১১ সালে তিস্তা চুক্তি তার আপত্তির কারণেই স্থগিত হয়েছিল। ফলে গঙ্গা চুক্তির ক্ষেত্রেও রাজ্য রাজনীতির প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

বাংলাদেশ কীভাবে দরকষাকষি করতে পারে

বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশকে শুধু পানির প্রশ্নে আটকে থাকলে চলবে না। পানি, ট্রানজিট, বিদ্যুৎ, বাণিজ্য এবং কানেক্টিভিটিকে একত্রিত করে ‘ইস্যু লিংকেজ’ কৌশলে আলোচনায় যেতে হবে।

বর্তমানে বাংলাদেশ ভারত থেকে এক হাজার ১৬০ মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ আমদানি করে। এছাড়া ট্রানজিট সুবিধা ও আঞ্চলিক যোগাযোগ ভারতের জন্য কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

এই সব ইস্যু একসঙ্গে টেবিলে আনলে বাংলাদেশের দরকষাকষির অবস্থান শক্ত হতে পারে।

আন্তর্জাতিকীকরণের সম্ভাবনা

বাংলাদেশ ঐতিহাসিকভাবে দ্বিপাক্ষিক আলোচনার পথেই সমস্যার সমাধান চেয়েছে। তবে জাতিসংঘের ১৯৯৭ সালের জলপথ কনভেনশনে যোগ দেওয়ার সম্ভাব্য ঘোষণা আন্তর্জাতিকীকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে মনে করছেন অনেকে।

যদি ২০২৬ সালের ডিসেম্বরে চুক্তি নবায়ন না হয়, তাহলে বিষয়টি আন্তর্জাতিক ফোরামে আরও জোরালোভাবে উঠতে পারে।

পানি কূটনীতির নতুন বাস্তবতা

২০২৫ সালে ভারত একতরফাভাবে ইন্দুস ওয়াটারস ট্রিটি স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নেয়। এই পদক্ষেপ দক্ষিণ এশিয়ায় পানি কূটনীতির নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।

বাংলাদেশের বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রবণতা গঙ্গা চুক্তির ক্ষেত্রেও প্রভাব ফেলতে পারে।

সামনে কী হতে পারে

সব মিলিয়ে, গঙ্গা পানি চুক্তি এখন আর শুধু একটি নদী বা পানিসম্পদ ইস্যু নয়। এটি দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক রাজনীতির সূক্ষ্ম ভারসাম্যের প্রতীক।

ভারতের জন্য এটি কৌশলগত চাপ প্রয়োগের হাতিয়ার হতে পারে। বাংলাদেশের জন্য এটি সার্বভৌম পানি অধিকার ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তার প্রশ্ন।

চুক্তির ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে—দুই দেশ সহযোগিতার পথে এগোবে, নাকি পানিকে কৌশলগত অস্ত্রে রূপ দেবে। উত্তর মিলবে আসন্ন মাসগুলোতেই।

Home » বাংলাদেশ > ভারত > গঙ্গা > চুক্তি
an adbox will go here