রোহিঙ্গাদের সশস্ত্র যুদ্ধের প্রস্তুতি—‘পরিকল্পিত গুজব’ বলছে রোহিঙ্গা বিশ্লেষকরা
দিগন্ত জার্নাল ডেস্ক:
রবিবার, ৬ এপ্রিল ২০২৫ || বাংলাদেশের কক্সবাজারে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের রাখাইনে সশস্ত্র লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছেন—সম্প্রতি এমন একটি প্রতিবেদন আন্তর্জাতিক এক গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে যেমন উদ্বেগ ছড়িয়েছে, তেমনি কূটনৈতিক অঙ্গনেও আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, কক্সবাজারের ক্যাম্প থেকেই রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের জান্তা সরকার ও বিদ্রোহী আরাকান আর্মির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের পরিকল্পনা করছে এবং তাদের লক্ষ্য ‘আরাকানের স্বাধীনতা’।
তবে রোহিঙ্গা নেতারা ওই তথ্যকে ‘ভিত্তিহীন ও ষড়যন্ত্রমূলক’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন। আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যানিটির সভাপতি ডা. মোহাম্মদ জোবায়ের বলেন, ‘‘রোহিঙ্গারা অস্ত্র নয়, মর্যাদা নিয়ে নিজভূমে ফিরতে চায়। কেউ কেউ বিভ্রান্তিকর তথ্য দিয়ে আমাদের জ’ঙ্গি বা স’ন্ত্রা’সী প্রমাণের অপচেষ্টা করছে। অথচ বাস্তবতা ভিন্ন। আমাদের একটাই চাওয়া—নিরাপদ প্রত্যাবাসন এবং নাগরিক অধিকার।’’
তিনি আরও বলেন, ‘‘রোহিঙ্গারা কখনো বার্মা (মিয়ানমার) থেকে আলাদা হতে চায়নি। তারা শুধু জন্মসনদ, চলাফেরা, শিক্ষা, চিকিৎসা ও নিরাপত্তাসহ পূর্ণ নাগরিক অধিকার চায়। এই অধিকার ছাড়া কোনো প্রত্যাবাসন টেকসই হবে না। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে বর্তমান সরকার আন্তর্জাতিক মহলে আমাদের অধিকার আদায়ে কার্যকর ভূমিকা রাখবে বলে আমরা আশাবাদী।’’
রোহিঙ্গা ক্যাম্পে নজর রাখা গোয়েন্দা সংস্থা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও এ ধরনের তথ্যকে ‘পরিকল্পিত গুজব’ হিসেবে প্রত্যাখ্যান করেছে। নিরাপত্তা বিশ্লেষক অবসরপ্রাপ্ত মেজর এমদাদুল ইসলাম বলেন, ‘‘ক্যাম্পে সংগঠিতভাবে সামরিক প্রশিক্ষণের সুযোগ নেই। কেউ বিচ্ছিন্নভাবে কিছু অস্ত্র নাড়াচাড়া করতে পারে, তবে তা বড়জোর ক্যাম্পে আধিপত্য বিস্তারের কৌশল—সেটিকে গেরিলা যুদ্ধের প্রস্তুতি বলা যাবে না।’’
তিনি বলেন, ‘‘সামরিক প্রশিক্ষণ মানে কৌশলগত সক্ষমতা, সংগঠন ও কাঠামো দরকার হয়—যা ক্যাম্পে নেই। ইতিহাস বলছে, অতীতে কিছু রোহিঙ্গা অস্ত্র ধরলেও তা ক্ষণস্থায়ী ছিল। এখন তারা নিপীড়িত, নিঃস্ব, এবং নিরাপত্তাহীন জীবনে অভ্যস্ত। এমন একটি জনগোষ্ঠী আবার সংগঠিতভাবে যুদ্ধ করবে, তা বিশ্বাসযোগ্য নয়।’’
শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) এবং অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ মিজানুর রহমান রোহিঙ্গাদের সশস্ত্র প্রস্তুতির অভিযোগকে ‘পরিকল্পিত ভারতীয় প্রোপাগান্ডা’ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, ‘‘ভারত চায় রোহিঙ্গা সংকট আরও জটিল হোক এবং এর মাধ্যমে বাংলাদেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতি অবনতির দিকে যাক।’’
তিনি অভিযোগ করেন, ‘‘সম্প্রতি ব্রিটিশ একটি গণমাধ্যমের নাম ভাঙিয়ে কিছু অনলাইন পোর্টাল বিভ্রান্তিকর সংবাদ প্রকাশ করেছে। আমি ব্যক্তিগতভাবে ঐ সংবাদের লিংক চাইলে কেউ দেখাতে পারেনি। এটি একটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপচেষ্টা। দেশ আমাদের সবার—সুতরাং দেশের স্বার্থে দায়িত্বশীলভাবে সংবাদ পরিবেশন করা উচিত।’’
একই ধরনের মত দিয়েছেন গোয়েন্দা সংস্থার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা এবং ক্যাম্পে দায়িত্বরত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাও। তারা জানিয়েছেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বর্তমানে এমন কোনো স’ন্ত্রা’সবাদী প্রস্তুতি বা সংগঠিত সশস্ত্র তৎপরতার প্রমাণ মেলেনি। বরং এসব গুজব ক্যাম্পের মানবিক পরিবেশকে অস্থিতিশীল করার অপচেষ্টা মাত্র।