ভূতাপেক্ষ পদোন্নতির অনিয়মে প্রশ্নের মুখে রিভিউ কমিটি - দিগন্ত জার্নাল

ভূতাপেক্ষ পদোন্নতির অনিয়মে প্রশ্নের মুখে রিভিউ কমিটি

দিগন্ত জার্নাল ডেস্ক:

শনিবার , ১৯ এপ্রিল ২০২৫ || ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনার শাসনামলে পদোন্নতিবঞ্চিত প্রশাসনের আরও ৭৭৬ জন কর্মকর্তার ভূতাপেক্ষ পদোন্নতির আবেদন পুনর্বিবেচনা করবে সরকার। এ লক্ষ্যে সাবেক অর্থসচিব ও বিশ্বব্যাংকের বিকল্প পরিচালক জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বে গঠিত পাঁচ সদস্যের রিভিউ কমিটির মেয়াদ আগামী ৩০ জুন পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। এর আগে গত ১০ ডিসেম্বর জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ৭৬৪ জনকে ভূতাপেক্ষ পদোন্নতি দেয়, যেখানে শুধু প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের বিবেচনায় নেওয়া হয়। অথচ সমানভাবে বঞ্চিত ছিলেন অন্য ক্যাডারদের বহু কর্মকর্তা, যাদের আবেদন আমলে নেওয়া হয়নি।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ভূতাপেক্ষ পদোন্নতির জন্য যোগ্য হওয়া সত্ত্বেও অনেকে সুপারিশ থেকে বাদ পড়েছেন, আবার কেউ কেউ আবেদন না করেও পদোন্নতি পেয়ে গেছেন। এতে করে রিভিউ কমিটির নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বঞ্চিত কর্মকর্তারা। তারা অভিযোগ করেন—অনেককে জ্যেষ্ঠতা না দিয়েই পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে, আবার কেউ দুদক মামলায় চার্জশিটভুক্ত কিংবা বিদেশি নাগরিকত্ব গ্রহণ করেও ভূতাপেক্ষ পদোন্নতির সুযোগ পেয়েছেন। বঞ্চিত কর্মকর্তাদের আশঙ্কা—এই অনিয়মের ফলে একদিকে তারা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, অন্যদিকে প্রশাসনে বৈষম্যের সংস্কৃতি আরও গভীর হচ্ছে।

বিভিন্ন ব্যাচের অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত সচিবদের ফোরাম জনপ্রশাসন সচিবের কাছে লিখিতভাবে অভিযোগ তুলে ধরে বলেন—যারা বারবার পদোন্নতিবঞ্চিত হয়েছেন, তাদের বাদ দিয়ে কখনো বঞ্চিত হননি এমন কর্মকর্তাকে ভূতাপেক্ষ পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। তারা উদাহরণ দেন, ১৯৮২ (বিশেষ) ব্যাচের নুসরাত জামান একাধিকবার ওএসডি ছিলেন, অথচ আবারো পদোন্নতি থেকে বাদ পড়েছেন। অন্যদিকে, নিয়মিতভাবে পদোন্নতি পাওয়া অনেককেই অতিরিক্ত সুবিধা দেওয়া হয়েছে। এ নিয়ে ক্ষোভ জানিয়ে বঞ্চিতরা বলেন—এতে মেধা, অভিজ্ঞতা, এমনকি ন্যায্য দাবির মূল্যায়নও প্রশ্নবিদ্ধ।

ফোরামের পক্ষ থেকে বলা হয়, এমনকি যেসব কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিদেশি নাগরিকত্ব গ্রহণের অভিযোগ রয়েছে, তাদেরও সচিব বা অতিরিক্ত সচিব পদে ভূতাপেক্ষ পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। এটি আইনের চরম লঙ্ঘন বলেও মন্তব্য করেন জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ ফিরোজ মিয়া।

একইসাথে, যারা ভূতাপেক্ষ পদোন্নতি পেয়েছেন তারাও সিনিয়রিটি না পাওয়ার অভিযোগ করছেন। পাঁচ শতাধিক কর্মকর্তার দাবি—যে তারিখ থেকে তারা পদোন্নতি পাওয়ার উপযুক্ত ছিলেন, সেই তারিখ থেকে সিনিয়রিটি না দেওয়ায় তারা আর্থিকভাবে বঞ্চিত হচ্ছেন।

এদিকে ভূতাপেক্ষ পদোন্নতিতে ‘আদার্স ক্যাডার’দের একেবারে উপেক্ষা করায় তারা ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে এবং এই পদোন্নতি প্রক্রিয়া বাতিলের দাবি জানিয়েছে। তাদের ভাষ্য, শুধুমাত্র প্রশাসন ক্যাডারকে সুবিধা দিতে গঠিত এ কমিটি পক্ষপাতমূলক আচরণ করেছে। এতে করে রাষ্ট্রীয় প্রশাসনিক কাঠামোতে চরম অসন্তোষ এবং বিভাজন সৃষ্টি হয়েছে।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় জানায়, পুনরায় আবেদন আহ্বান করা হবে না; শুধু যারা নিজেরা আবেদন করবেন, তাদের আবেদনই রিভিউ কমিটিতে উপস্থাপন করা হবে। তবে এই অবস্থান নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে, কারণ ইতিমধ্যেই স্বেচ্ছায় অবসরে যাওয়া কিংবা আবেদন না করা ব্যক্তিদের ভূতাপেক্ষ পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে।

বঞ্চিত কর্মকর্তা ও বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই ভূতাপেক্ষ পদোন্নতির নামে এক ধরনের রাজনৈতিক সুবিধা ও প্রশাসনিক প্রভাব খাটিয়ে একশ্রেণির কর্মকর্তাকে পুরস্কৃত করা হয়েছে। এখন সময় এসেছে—পদোন্নতির সঠিক মানদণ্ড নির্ধারণ, রিভিউ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের। না হলে প্রশাসনে জবাবদিহিতা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না।

an adbox will go here