ফারাক্কার প্রভাবে পদ্মা অববাহিকার ১২ জেলার ৩৮ উপজেলায় নদী ভাঙন ভয়াবহ রূপ নিয়েছে - দিগন্ত জার্নাল

ফারাক্কার প্রভাবে পদ্মা অববাহিকার ১২ জেলার ৩৮ উপজেলায় নদী ভাঙন ভয়াবহ রূপ নিয়েছে

দিগন্ত জার্নাল ডেস্ক:

সোমবার, ২৮ এপ্রিল ২০২৫ | মরণবাঁধ ফারাক্কার ধ্বংসাত্মক প্রভাবে পদ্মা অববাহিকার ১২টি জেলার ৩৮টি উপজেলায় নদী ভাঙন তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। পদ্মা তীরবর্তী ও সংলগ্ন এলাকায় বসবাসকারী প্রায় আড়াই কোটি মানুষ প্রতিবছর আকস্মিক বন্যা ও নদী ভাঙনে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। ১৯৭৫ সালের ২১ এপ্রিল গঙ্গা নদীর ওপর ভারতের নির্মিত ফারাক্কা বাঁধ চালুর পর অতিক্রান্ত হয়েছে প্রায় ৫০ বছর। এই সময়ে ফারাক্কার প্রভাবে বাংলাদেশের প্রায় ২৫০ কিলোমিটার এলাকা ব্যাপী পদ্মা নদীর দুই তীর ও চরাঞ্চলে বসবাসকারী কোটি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।

ভাঙন থেকে বাঁচতে মানুষ বারবার বসতভিটা সরিয়ে নিলেও শেষ পর্যন্ত হারিয়েছেন সহায়-সম্বল, বসতভিটা ও জমিজমা। হারানো জমিজমাগুলো এখন পদ্মার বুকে বালুর আস্তরণে ঢাকা পড়ে আছে। নদীভাঙনের শিকার মানুষজন জন্মস্থান ছেড়ে দূরপ্রান্তের অচেনা জনপদে আশ্রয় নিয়েছেন। একসময়ের সামর্থ্যবান কৃষক ও গৃহস্থরা পরিণত হয়েছেন দিনমজুরে। অপরদিকে নদী ভাঙন ঠেকাতে রাষ্ট্রের হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় হচ্ছে প্রতি বছর।

ভুক্তভোগীরা জানান, ফারাক্কা বাঁধ চালুর আগেও নদী ভাঙন ছিল, তবে এতটা ভয়াবহতা ছিল না। এখন পদ্মার বুকজুড়ে জমছে কোটি কোটি টন বালু, পলিমাটি আসছে না বললেই চলে। ফলে পদ্মা নদী মরুভূমির মতো রূপ নিয়েছে এবং সরু চ্যানেলে পানি প্রবাহিত হচ্ছে। বিশেষ করে ফারাক্কার ১৮ কিলোমিটার ভাটিতে চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার বোগলাউড়ি, লক্ষ্মীপুর ও বাবপুর গ্রামের মানুষ চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। এক দশক আগেও জমিসম্পদ ও ধানক্ষেতে সমৃদ্ধ এসব গ্রামের বাসিন্দারা এখন দিনমজুরে পরিণত হয়েছেন।

সরেজমিনে দেখা গেছে, পাঁকার বিশরশিয়া, নামোজগন্নাথপুর, দোভাগী, মনোহরপুর, কানছিড়া, উজিরপুরসহ বহু গ্রাম নদীভাঙনের কবলে পড়ে শত শত পরিবার বেড়িবাঁধের নিচে গাদাগাদি করে মানবেতর জীবন যাপন করছে। নদীর দুই কিলোমিটার ভেতরের উজিরপুর ও রাধাকান্তপুর গ্রামের মতো একসময়ের স্বচ্ছল জনপদ এখন কেবল স্মৃতির নাম।

ফারাক্কার নিকটবর্তী চাঁপাইনবাবগঞ্জের দুর্লভপুর, মনাকষা, জোহরপুর, নারায়ণপুর, চরবাগডাঙ্গা, আলাতুলি, দেবিনগর ও শাজাহানপুর এলাকায় ৩০ কিলোমিটারব্যাপী পদ্মার ভাঙন চলছে। এসব এলাকার লক্ষাধিক মানুষ উদ্বাস্তু হয়ে পড়েছেন। উত্তর পাড়ে জমি হারিয়ে দক্ষিণ প্রান্তের চরে আশ্রয় নেওয়া মানুষগুলোর জীবন এখন আবার নতুন ভাঙনের হুমকিতে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী এসএম আহসান হাবীব জানান, ফারাক্কার ১১৯টি গেটের যেকোনো দিকের গেট খোলা হলে পদ্মার উত্তর অথবা দক্ষিণ পাড়ে ভাঙন তীব্র আকার ধারণ করে। উপরন্তু, দীর্ঘদিনের পানির একতরফা প্রত্যাহারের ফলে পদ্মার বুক ভরাট হয়ে যাওয়ায় নদীর প্রবাহ ও ধারণক্ষমতা ৮০ শতাংশ কমে গেছে। বর্ষাকালে ফারাক্কার সবগুলো গেট খুলে দেওয়া হলে আকস্মিক জলস্ফীতি দেখা দেয় এবং দুই পাড়ের গ্রামগুলো ভয়াবহ বন্যার কবলে পড়ে।

এছাড়া নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার হাজার হাজার পরিবার তাদের জন্মভিটা ছেড়ে রাজশাহী, নওগাঁ, দিনাজপুর ও ঠাকুরগাঁওসহ বিভিন্ন জেলায় পাড়ি জমিয়েছে। সেখানেও তারা দিনমজুর ও ফেরিওয়ালার মতো প্রান্তিক পেশায় যুক্ত হয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছেন। একই রকম দুর্দশা ভাটির ফরিদপুর, শরীয়তপুর, কুষ্টিয়া, পাবনা, রাজবাড়ী, মাদারীপুর, মানিকগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জসহ আরও বহু জেলায় বিরাজমান।

পাউবোর গবেষণায় দেখা গেছে, শুধু জমিজমা নয়, ফসলি জমি, স্কুল-কলেজ, রাস্তাঘাট পর্যন্ত হারিয়ে যাচ্ছে নদী গর্ভে। নদী তীরবর্তী মানুষরা জীবিকা হারিয়ে দরিদ্র হচ্ছে, পাশাপাশি পলি না এসে শুধু বালু আসার ফলে চরাঞ্চলে কৃষিকাজও ক্রমশ অসাধ্য হয়ে উঠছে।

বিশিষ্ট নদী গবেষক মাহবুব সিদ্দিকী জানান, ফারাক্কা বাঁধ চালুর পর ১৯৭৫ থেকে ১৯৯২ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে সোয়া লাখ কোটি টাকা। বর্তমানে প্রতি বছর বাংলাদেশের ১২টি জেলার আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকা। নদীভাঙনজনিত এই ক্ষতি বাংলাদেশের পদ্মা তীরবর্তী জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক ও সামাজিক নিরাপত্তাকে মারাত্মকভাবে বিপর্যস্ত করে তুলেছে।

an adbox will go here