পিআর পদ্ধতি নিয়ে বিতর্কের নেপথ্যে
নিজস্ব প্রতিবেদক:
বৃহস্পতিবার, (৩ জুলাই ২০২৫) জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব বা পিআর (Proportional Representation) পদ্ধতি চালু করা হবে কি না—তা নিয়ে দেশের রাজনীতিতে এখন তীব্র মতবিরোধ ও বিভক্তি দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে সংসদের উচ্চকক্ষে পিআর পদ্ধতির প্রস্তাবনা সামনে আসার পর তা রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলোর ভিন্ন ভিন্ন অবস্থানের কারণে বিষয়টি হয়ে উঠেছে আরও জটিল।
পিআর বিতর্কের প্রেক্ষাপট: সংবিধান সংস্কার কমিশন ও নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের প্রস্তাব একীভূত করে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন যে সুপারিশ তৈরি করেছে, সেখানে উচ্চকক্ষে পিআর পদ্ধতি চালুর প্রস্তাব রাখা হয়েছে। কিন্তু এটি নিয়ে বিএনপি ও সমমনা ছয়টি জোট প্রকাশ্য বিরোধিতা করেছে। তাদের মতে, এ প্রস্তাব বাস্তবায়ন হলে দেশের নির্বাচনি সংস্কৃতির স্বাভাবিক ধারাবাহিকতা ব্যাহত হতে পারে।
অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ কেবল উচ্চকক্ষ নয়, বরং সংসদের উভয় কক্ষে পিআর পদ্ধতি চালুর দাবিতে সোচ্চার। এদের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এনসিপি ও নাগরিক ঐক্যসহ বেশ কিছু দল উচ্চকক্ষে পিআর পদ্ধতির পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।
সংসদ দ্বিকক্ষ করার প্রস্তাব: ২৯ জুন অনুষ্ঠিত ঐকমত্য কমিশনের বৈঠকে জাতীয় সংসদকে নিম্ন ও উচ্চকক্ষে বিভক্ত করার প্রস্তাব চূড়ান্তভাবে উপস্থাপন করা হয়। সেখানে বলা হয়, নিম্নকক্ষে বর্তমান সরাসরি ভোট পদ্ধতি বহাল থাকবে। তবে সংরক্ষিত নারী আসনের সংখ্যা বাড়িয়ে ৫০ থেকে ১০০ করা হবে এবং তা সরাসরি নির্বাচনের মাধ্যমে নির্ধারিত হবে।
উচ্চকক্ষে ১০০ সদস্য মনোনীত হবেন রাজনৈতিক দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে, অর্থাৎ পিআর ভিত্তিতে। তবে এই উচ্চকক্ষ অর্থবিল বাদে অন্যান্য আইন প্রণয়নে পর্যালোচনা ও পরামর্শ দিতে পারবে, এবং সংবিধান সংশোধন, জাতীয় নিরাপত্তা চুক্তি বা যুদ্ধ ঘোষণায় উচ্চকক্ষের সম্মতির প্রয়োজন হবে।
বিএনপির অবস্থান ও সংশয়: বিএনপি এই প্রস্তাবের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। ১ জুলাই দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ‘গণ-অভ্যুত্থান ২০২৪ : জাতীয় ঐক্য ও গণতান্ত্রিক অভিযাত্রা’ শীর্ষক আলোচনা সভায় বলেন,
“সংখ্যানুপাতিক ব্যবস্থা ঐক্যের পরিবর্তে সমাজে বিভক্তি ও একটি অস্থিতিশীল সরকার তৈরির কারণ হতে পারে। এ ব্যবস্থার আড়ালে ফ্যাসিস্ট শক্তিকে পুনর্বাসনের চেষ্টা হচ্ছে কি না, তা নিয়ে গভীরভাবে ভাবার সময় এসেছে।”
বিএনপির মতে, পিআর পদ্ধতির আলোচনা সামনে এনে নির্বাচন প্রলম্বিত করার ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে এবং ছোট দলগুলো সংসদে আসনের সংখ্যা বাড়িয়ে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করতে চাইছে।
বিভিন্ন দলের ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি: ঐকমত্য কমিশনের প্রস্তাবে নিম্নকক্ষে সরাসরি ভোট ও উচ্চকক্ষে পিআর ভিত্তিক আসন বণ্টন অনুমোদনের প্রস্তাব থাকলেও এনসিপি ও নাগরিক ঐক্য তা পুরোপুরি সমর্থন করেনি। এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন বলেন,
“নিম্নকক্ষের অনুপাতে উচ্চকক্ষ গঠন করলে সেটি নিম্নকক্ষের রেপ্লিকা হবে। উচ্চকক্ষের আলাদা শক্তি না থাকলে তার প্রয়োজনীয়তাও নেই।”
অন্যদিকে, জামায়াতের নেতারা বলেন,
“পিআর পদ্ধতিতে প্রত্যেকটি ভোট সংসদে প্রতিফলিত হয়, যার ফলে স্বৈরাচারী শাসনের সুযোগ কমে যায়।”
তবে বিএনপি বলছে, বাংলাদেশে পিআর পদ্ধতি চালুর মতো রাজনৈতিক পরিবেশ এখনো গড়ে ওঠেনি। এ ব্যবস্থাকে কার্যকর করতে হলে কমপক্ষে এক দশক সময় লাগবে।
বিশ্লেষকদের মত: নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ড. মো. আব্দুল আলীম বলেন,
“বিশ্বের অন্তত ৯০টি দেশে পিআর পদ্ধতি চালু রয়েছে। এতে ভোটের অপচয় কম হয়, আর দলগুলোর ওপর ভোটারের দায়বদ্ধতা বাড়ে। তবে রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য ছাড়া এটি বাস্তবায়ন সম্ভব নয়।”
তিনি আরও বলেন,
“বাংলাদেশে এই পদ্ধতি নতুন হওয়ায় তা নিয়ে যথেষ্ট আলোচনার প্রয়োজন রয়েছে। শুধু প্রস্তাব করলেই হবে না, এর সাংবিধানিক ভিত্তি, সাংগঠনিক সক্ষমতা ও জনগণের প্রস্তুতির বিষয়গুলোও বিবেচনায় নিতে হবে।”
সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতি নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর ভিন্নমত এবং ঐকমত্যের অভাব প্রমাণ করে যে, দেশের নির্বাচন ব্যবস্থা নিয়ে এখনো একটি সুসংগঠিত জাতীয় ঐক্য গড়ে ওঠেনি। এই বাস্তবতা যতদিন থাকবে, ততদিন নির্বাচনসংক্রান্ত যেকোনো সংস্কার জটিল রাজনৈতিক বিতর্কে বন্দি থাকবেই। নির্বাচনের সময় ও পদ্ধতি নিয়ে এমন অনিশ্চয়তা দেশের গণতন্ত্র ও জনগণের আস্থার জন্য চরম পরীক্ষার সময় হয়ে দাঁড়িয়েছে।