গাজীপুরের এমএলএম প্রতারণার মূল হোতা ইকবাল হোসেন: এক কলম সৈনিক থেকে ‘ডিজিটাল জালিয়াতি’র সম্রাট
দ্বিতীয় পর্ব
শুক্রবার, ১৮ জুলাই ২০২৫ | দিগন্ত জার্নাল রিপোর্ট
গাজীপুরে সাংবাদিক পরিচয়ের আড়ালে গড়ে ওঠা একটি বহুল আলোচিত ডিজিটাল প্রতারণা সাম্রাজ্যের মূল কারিগর হিসেবে উঠে এসেছেন এস এম ইকবাল হোসেন। এক সময় যিনি রিপোর্টিং ডেস্কের পরিচিত মুখ ছিলেন, আজ তিনি কোটি টাকার জালিয়াতি মামলার প্রধান অভিযুক্ত হিসেবে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।
তদন্তে জানা গেছে, ইকবাল হোসেন ছিলেন শুধু পরিকল্পনাকারীই নন, বরং তিনিই পুরো প্রতারণা চক্রের মূল অপারেটর। মাঠপর্যায়ে রিক্রুটিং, ওয়েবসাইট ডিজাইন, ইনভেস্টর প্রলোভন, এবং অর্থ উত্তোলন—সবকিছুর মূল নিয়ন্ত্রণ ছিল তার হাতেই। সাংবাদিক পরিচিতি ও গাজীপুর মহানগর প্রেসক্লাবের সিনিয়র সহ-সভাপতির (সাবেক) পদকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে, তিনি সাধারণ সাংবাদিকদের বিশ্বাস ভাঙেন এবং ফাঁদে ফেলেন।
তাকে ঘিরেই চালু হয় macvz.com-এর ‘Mistral AI’ এবং kiaix.com-এর ‘KumoAI’ নামে দুটি ভুয়া ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সেবা দেওয়ার নামে এসব সাইটে চালানো হয় নিষিদ্ধ পিরামিড স্কিম, যা মাল্টিলেভেল মার্কেটিং নিয়ন্ত্রণ আইন ২০১৩ অনুযায়ী দেশে অবৈধ।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে, ইকবাল হোসেনের নেতৃত্বে এই প্রতারণা চক্র তিন স্তরে অপারেশন চালায়। প্রথম স্তরে সাংবাদিক ও পরিচিতজনদের রেফারেল বোনাস ও দ্রুত মুনাফার লোভ দেখানো হয়। দ্বিতীয় স্তরে বিনিয়োগকারীদের মাধ্যমেই আরও নতুন বিনিয়োগকারী সংগ্রহ করা হয়। তৃতীয় স্তরে ‘সিস্টেম হ্যাকড’ নাটক সাজিয়ে হঠাৎ সক্রিয় প্ল্যাটফর্মগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং টাকা আত্মসাৎ করে তারা গা ঢাকা দেয়।

প্রতারণার শিকার বহু সাংবাদিক ও সাধারণ মানুষ এখন নিঃস্ব। কারও সংসারের সঞ্চয়, কারও ভরণপোষণের অর্থ—সবকিছুই এই চক্রের ফাঁদে পড়ে হারিয়ে গেছে। শুধু গাজীপুর নয়, রংপুর, খুলনা, বগুড়া, চট্টগ্রামসহ দেশের নানা অঞ্চল থেকে শতাধিক পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
ঘটনার বিস্তার পাওয়ার পর ক্ষুব্ধ কিছু ভুক্তভোগী তাদের ও ইকবাল হোসেনের মধ্যে হওয়া কথোপকথনের অডিও রেকর্ড সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশ করেন। একাধিক রেকর্ডে ইকবালকে বলতে শোনা যায়, “আরেকটু সময় দেন ভাই, বড় ইনভেস্টর আসতেছে, সবার টাকা ফেরত যাবে।” এসব রেকর্ড থেকেই তার ‘মাস্টারমাইন্ড’ ভূমিকা স্পষ্ট হয় বলে দাবি তদন্তকারীদের।
বর্তমানে ইকবাল হোসেন ও তার সহযোগী তারেক রহমান জাহাঙ্গীর গা ঢাকা দিয়েছেন। অভিযোগ রয়েছে, তারা দেশত্যাগের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। কয়েকজন ভুক্তভোগী ইতোমধ্যে ইমিগ্রেশন পুলিশকে তথ্য দিয়েছেন এবং সতর্ক করেছেন।
এই প্রতারণা চক্র ধর্মীয় আবেগ, চাকরির ভয় ও দায়বদ্ধতার চাপ দিয়ে মানুষকে মানসিকভাবে কোণঠাসা করত। তাদের প্রচার ছিল, “এই প্রজেক্ট ইসলামী এআই-এর জন্য, আপনি যদি অংশ না নেন, আপনার ঈমান থাকবে না”, কিংবা “চাকরিতে থাকতে হলে আপনাকে যুক্ত হতেই হবে”—এমন কথায় অনেকে বাধ্য হয়ে বিনিয়োগ করেন।
গাজীপুর নাগরিক কমিটি, মানবাধিকার সংগঠন এবং স্থানীয় সাংবাদিক ফোরাম এই ঘটনার বিরুদ্ধে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পৃথক অভিযোগপত্র জমা দিয়েছে। তারা একবাক্যে বলছেন—“সাংবাদিকতার পবিত্রতাকে যারা ব্যবসায়িক প্রতারণার মুখোশ বানিয়েছে, তাদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।”
প্রাসঙ্গিক আইন অনুযায়ী, মাল্টিলেভেল মার্কেটিং নিয়ন্ত্রণ আইন ২০১৩-তে বলা হয়েছে—লাইসেন্স ছাড়া এমএলএম ব্যবসা চালানো দণ্ডনীয় অপরাধ, যার সর্বোচ্চ শাস্তি পাঁচ বছর কারাদণ্ড এবং পঞ্চাশ লাখ টাকা জরিমানা। সেই সঙ্গে প্রতারণায় ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য ক্ষতিপূরণ আদায়ের ব্যবস্থাও রাখা আছে।

এই ঘটনায় ইকবাল হোসেনকে প্রধান করে গাজীপুর সদর থানায় একটি লেখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে
এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে ভুক্তভোগীরা খুব দ্রুতই প্রধান অভিযুক্তে গ্রেফতার করে শাস্তির আওতায় আনার আহ্বান জানান।
✍️ প্রতিবেদন: অনুসন্ধানী ডেস্ক, দিগন্ত জার্নাল 📅 প্রকাশকাল: শুক্রবার, ১৮ জুলাই ২০২৫