নারায়ণগঞ্জে লুন্ঠিত অস্ত্রের স্রোত, নির্বাচনের আগে অস্থিরতা ও নিরাপত্তাহীনতার ছায়া
দিগন্ত জার্নাল ডেস্ক:
সোমবার, ২৮ জুলাই ২০২৫ | নারায়ণগঞ্জ: থানা থেকে লুন্ঠিত অস্ত্র ও আগ্নেয় গোলাবারুদ এখনো উদ্ধার করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। শুধু তাই নয়, বিগত ফ্যাসিস্ট আমলে ক্ষমতাসীন দলের ছত্রছায়ায় বৈধ-অবৈধ অস্ত্রধারীদের কর্মকাণ্ডও আজ নতুন করে প্রশ্নের মুখে ফেলছে আইন-শৃঙ্খলা ব্যবস্থাকে। নির্বাচনের আগে এই অস্ত্রভাণ্ডার প্রশাসনের জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
থানা থেকে লুট, সন্ত্রাসীদের হাতে অস্ত্র
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার ও সিদ্ধিরগঞ্জ থানায় হামলা চালিয়ে দুর্বৃত্তরা লুট করে নেয় বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গুলি। পুলিশের খাতায় এখনো ৪২টি আগ্নেয়াস্ত্র ও কয়েক হাজার গুলি-কার্তুজের হিসাব অনুপস্থিত। লুট হওয়া অস্ত্রের মধ্যে রয়েছে:
- চায়না রাইফেল (7.62mm) – ৭টি
- এসএমজি (7.62mm) – ১টি
- এলএমজি (7.62mm) – ১টি
- পিস্তল (7.62mm ও 9mm) – মোট ১২টি
- শটগান (12 bore) – ১৬টি
- টিয়ার গ্যাস শেল ও গুলি – প্রায় ৭,৫০০টি বিভিন্ন প্রকার
পুলিশ ও র্যাব জানিয়েছে, অস্ত্র উদ্ধারে অভিযান চলছে। তবে সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন, এই অস্ত্রের একটি বড় অংশ ইতোমধ্যে রাজনৈতিক সন্ত্রাসী ও কিশোর গ্যাংদের হাতে চলে গেছে।
অস্ত্র হয়ে উঠেছে আধিপত্যের হাতিয়ার
বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, নারায়ণগঞ্জে বাসস্ট্যান্ড, টেম্পোস্ট্যান্ড, জমি দখল, আবাসন ব্যবসা, মাদক ও ঝুট বাণিজ্য কেন্দ্রিক বিরোধে এসব অবৈধ অস্ত্র নিয়মিত ব্যবহৃত হচ্ছে। একাধিক সংঘর্ষে দেখা গেছে, খোদ ছাত্র-যুবলীগ, ছাত্রদল ও যুবদলের নেতাকর্মীরা অস্ত্র হাতে গুলি চালাচ্ছে—কিন্তু সেসব অস্ত্রের হদিস নেই প্রশাসনের কাছে।
লাইসেন্সের আড়ালে সন্ত্রাসের লাইসেন্স
বিগত সরকার আমলে জেলা প্রশাসনের কাছ থেকে শতাধিক আওয়ামী লীগ ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি ও সন্ত্রাসী অস্ত্রের লাইসেন্স পেয়েছে বলে জানা গেছে। এদের মধ্যে আছেন সাবেক সংসদ সদস্য শামীম ওসমান, তার ছেলে অয়ন ওসমানসহ একাধিক ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও দলীয় ক্যাডার। ৫ আগস্ট সরকারের পতনের পর এদের অনেকেই দেশত্যাগ করেছে, কিন্তু অস্ত্র জমা দেয়নি। ফলে বৈধ অস্ত্রও এখন কার্যত অবৈধ।
সরকারি প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৪-এর মধ্যে সব লাইসেন্সকৃত ও অবৈধ অস্ত্র থানায় জমা দেওয়ার নির্দেশ থাকলেও বহু অস্ত্র এখনো অনুপস্থিত।
প্রকাশ্যে গুলি, গোপনে ব্যর্থতা
গত এক বছরে অন্তত ৮টি বড় সংঘর্ষ ও হত্যাকাণ্ডে প্রকাশ্যে গুলি চালানোর ঘটনা ঘটেছে নারায়ণগঞ্জে। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই অস্ত্র উদ্ধারে প্রশাসন ব্যর্থ হয়েছে।
- ১৯ জুলাই: শামীম ওসমানের নেতৃত্বে অস্ত্র মহড়া, শিক্ষার্থীদের ওপর গুলি
- ১০ জুন: রূপগঞ্জে গুলিতে ব্যবসায়ী নিহত
- ২৪ ডিসেম্বর: ছাত্রদলের অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষে মৃত্যু
- ১১ এপ্রিল: ব্যবসা সংক্রান্ত বিরোধে যুবদলকর্মী খুন
- ৬ মার্চ ও ২২ সেপ্টেম্বর: বাসস্ট্যান্ড ও ঝুট ব্যবসা নিয়ে সংঘর্ষ, অস্ত্রের প্রকাশ্য ব্যবহার
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতিক্রিয়া ও রাজনৈতিক শঙ্কা
পুলিশ সুপার প্রত্যুষ কুমার মজুমদার জানান, “লুট হওয়া অস্ত্রের একটি অংশ উদ্ধার করা হয়েছে। বাকিগুলো উদ্ধারে অভিযান চলছে।” র্যাব-১১ এর অধিনায়ক লে. কর্নেল এইচএম সাজ্জাত হোসেন বলেন, “অস্ত্র উদ্ধারে গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।”
তবে রাজনৈতিক নেতারা এ বক্তব্যে সন্তুষ্ট নন। বিএনপি নেতা সাখাওয়াত হোসেন খান বলেন,
“অস্ত্র উদ্ধার ও সন্ত্রাসী গ্রেফতারে চরম ব্যর্থতা রয়েছে। এভাবে নির্বাচন হলে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা নেই।”
গণসংহতি আন্দোলনের নেতা অঞ্জন দাস বলেন,
“থানা থেকে অস্ত্র লুট, সন্ত্রাসীদের হাতে অস্ত্র—সবই প্রমাণ করে রাষ্ট্রীয় কাঠামো ভঙ্গুর হয়ে পড়েছে।”
জামায়াতের মাওলানা মঈনুদ্দিন আহমাদ বলেন,
“নির্বাচনের আগে অস্ত্র উদ্ধার ও দায়ীদের বিচার নিশ্চিত করতে হবে—নইলে গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাবে।”
নারায়ণগঞ্জ এখন অস্ত্রবাজির শহর নয়, বরং অস্ত্র-নির্ভর রাজনীতি ও সংঘাতের অনিবার্য বিস্ফোরণের উপান্তে দাঁড়িয়ে। নির্বাচনের আগে এই অস্ত্র উদ্ধার না হলে, নির্বাচন শুধু প্রশ্নবিদ্ধই হবে না, বরং গণতন্ত্রের রক্তাক্ত মুখও দেখতে হতে পারে দেশবাসীকে।