আলোকবর্তিকা আখতার হামিদ খান: পল্লী উন্নয়নের এক যুগান্তকারী পথিকৃৎ - দিগন্ত জার্নাল

আলোকবর্তিকা আখতার হামিদ খান: পল্লী উন্নয়নের এক যুগান্তকারী পথিকৃৎ

দিগন্ত জার্নাল ডেস্ক:

সোমবার, ২৮ জুলাই ২০২৫ | বাংলাদেশের পল্লী উন্নয়নের ইতিহাসে এক দীপ্তমান নাম—ড. আখতার হামিদ খান। তিনি শুধু একজন উন্নয়নচিন্তক নন, ছিলেন তৃণমূলের মানুষের নির্ভরতার প্রতীক, ছিলেন স্বপ্ন দেখার কারিগর। বাংলাদেশ একাডেমি ফর রুরাল ডেভেলপমেন্ট (বার্ড)-এর প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তিনি যেমন কুমিল্লাকে উন্নয়নের একটি জ্যোতির্ময় জনপদে রূপান্তরিত করেন, তেমনি সারাদেশেই ছড়িয়ে দেন অংশীদারিত্বভিত্তিক পল্লী জাগরণের নতুন দিগন্ত।

প্রান্তিক মানুষের হাতে স্বাবলম্বনের চাবিকাঠি

আখতার হামিদ খানের অনন্য কৃতিত্ব ‘কুমিল্লা মডেল’, যার মূল দর্শন ছিল—“উন্নয়নের জন্য জনগণই প্রধান শক্তি।” এই মডেলের একটি বিশেষ অঙ্গ ছিল দ্বিস্তর সমবায় পদ্ধতি, যা পরবর্তীতে বিআরডিবি-র মাধ্যমে বাস্তবায়িত হয়ে সমাজের অবহেলিত জনগোষ্ঠীকে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করে তোলে।

গ্রামীণ নারীদের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নে তিনি শুরু করেন সেলাই, হস্তশিল্প, কুটিরশিল্প ইত্যাদি প্রশিক্ষণ কর্মসূচি। শুধু অর্থনৈতিক নয়, পল্লী জনগোষ্ঠীর বাসস্থান, পরিবার পরিকল্পনা, অবকাঠামো উন্নয়ন, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষাসহ সামগ্রিক জীবনমান উন্নয়নে তিনি ছড়িয়েছেন কার্যকর কর্মসূচির আলো।

শেকড়ের খোঁজে অগ্রদূত

১৯১৪ সালের ১৫ জুলাই ভারতের আগ্রায় জন্ম নেওয়া এই মানুষটি ছিলেন আদ্যন্ত এক সমাজবিজ্ঞানী ও ভাবুক। পেশাগত জীবনে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের অধ্যক্ষ থেকে শুরু করে পাকিস্তান আমলে ১৯৫৯ সালের ২৭ মে কুমিল্লায় প্রতিষ্ঠা করেন Pakistan Academy for Rural Development (PARD), যা স্বাধীনতা-পরবর্তীকালে বাংলাদেশ একাডেমি ফর রুরাল ডেভেলপমেন্ট (বার্ড)-এ রূপান্তরিত হয়।

তার উদ্যোগে স্থাপিত কুমিল্লার বার্ড ভবনগুলো প্রকৃতির সৌন্দর্য সংরক্ষণ করে গ্রিক স্থাপত্যরীতিতে নির্মিত, যা আজও দৃষ্টি ও চেতনার এক অপার স্থাপত্য নিদর্শন।

ঔরাঙ্গী থেকে কুমিল্লা: অংশীদারিত্ব উন্নয়নের বিশ্বদৃষ্টি

১৯৮০ সালে করাচির ‘ঔরাঙ্গী পাইলট প্রজেক্ট’ তাঁর আন্তর্জাতিক দৃষ্টিভঙ্গির এক নিদর্শন। নগর দারিদ্র্য হ্রাস ও স্বনির্ভরতা অর্জনে অংশীদারিত্বভিত্তিক উন্নয়ন ধারার তিনি ছিলেন অন্যতম পথিকৃৎ। তার প্রয়াস বিশ্বব্যাপী অংশগ্রহণমূলক উন্নয়ন দর্শনের পথপ্রদর্শক হয়ে ওঠে।

বার্ড: একটি আন্দোলনের নাম

কুমিল্লা শহর থেকে ৮ কিলোমিটার দূরে, ময়নামতির পাহাড়ঘেরা প্রাকৃতিক নৈসর্গিক পরিবেশে ১৫৬ একর জমিতে গড়ে ওঠা বার্ড আজও গ্রামীণ উন্নয়নের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। এখানে:

  • প্রায় ৪০০ জন প্রশাসনিক জনবল
  • ৮০০+ গবেষণা প্রতিবেদন
  • ৪ লাখের বেশি প্রশিক্ষিত পল্লী উন্নয়নকর্মী
  • ৭০ হাজারেরও বেশি বই-সমৃদ্ধ গ্রন্থাগার
  • এবং, রয়েছে ড. আখতার হামিদ খানের নামে নামাঙ্কিত গবেষণাকেন্দ্র

বার্ডের মহাপরিচালক সাইফ উদ্দিন আহমেদ বলেন,

“ড. আখতার হামিদ খান এই অঞ্চলে আলোর প্রদীপ জ্বালিয়েছেন। তাঁর কুমিল্লা মডেল আজ বিশ্বে সমাদৃত।”

জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আমিরুল কায়সার মন্তব্য করেন,

“তিনি ছিলেন আলোকবর্তিকা। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে একীভূত করে সমাজে যে বিপ্লব সৃষ্টি করেছেন, তা যুগ যুগ ধরে অনুসরণীয় হয়ে থাকবে।”

জীবন ও উত্তরাধিকার

১৯৯৯ সালের ৯ অক্টোবর যুক্তরাষ্ট্রে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন ড. আখতার হামিদ খান। কিন্তু রেখে যান এক বিশাল উত্তরাধিকার—একটি উন্নয়ন দর্শন, একটি জাগরণ আন্দোলন।

তার কীর্তির স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি পেয়েছেন:

  • র‌্যামন ম্যাগসেসে অ্যাওয়ার্ড
  • জিন্নাহ অ্যাওয়ার্ড
  • নিশান-ই-ইমতিয়াজ
  • সিতারা-ই-ইমতিয়াজ এবং ১৯৮৬ সালে বার্ডকে স্বাধীনতা পুরস্কার দেওয়া হয়।

ড. আখতার হামিদ খান আজ শুধু একটি নাম নয়, বরং একটি দর্শন—পল্লী উন্নয়নের, মানুষকে মানুষ হিসেবে মূল্যায়নের। তাঁর কুমিল্লা মডেল আমাদের মনে করিয়ে দেয়: রাষ্ট্র তখনই বিকশিত হয়, যখন শেকড়ে আলো জ্বলে।

an adbox will go here