ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে ভোট গ্রহণ ও গণভোট শুরু
নিজস্ব প্রতিবেদক। জাতীয় । বৃহস্পতিবার, ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
বাংলাদেশ: বহুল প্রত্যাশিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও রাষ্ট্রীয় সংস্কার বিষয়ক গণভোট শুরু হয়েছে। বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত দেশের ২৯৯টি সংসদীয় আসনের ৪২ হাজার ৯৫৮টি ভোটকেন্দ্রে বিরতিহীনভাবে ভোটগ্রহণ চলছে। জামায়াতে ইসলামীর এক প্রার্থীর মৃত্যুর কারণে শেরপুর-৩ আসনের ভোট স্থগিত রয়েছে।
এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে দেশে একটি নির্বাচিত সরকার প্রতিষ্ঠার পথ উন্মুক্ত হচ্ছে। একই সঙ্গে রাষ্ট্রীয় সংস্কার প্রশ্নে জনগণের সরাসরি মতামত গ্রহণের সুযোগ তৈরি হয়েছে, যা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অনন্য ঘটনা।
ভোটাধিকার পুনরুদ্ধারের দিন
দেড় যুগ পর দেশের মানুষ আবার স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভোট দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছে। ভোটাররা শুধু আগামী পাঁচ বছরের জন্য প্রতিনিধি নির্বাচন করছেন না, বরং তারা অংশ নিচ্ছেন গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার পুনর্গঠনে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই নির্বাচন বাংলাদেশের জন্য কেবল একটি সাংবিধানিক প্রক্রিয়া নয়; এটি গণতন্ত্রে উত্তরণের প্রথম দৃশ্যমান ধাপ।
আন্তর্জাতিক নজর বাংলাদেশের দিকে
জুলাই ছাত্র-গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী এই নির্বাচনকে ঘিরে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নজর এখন বাংলাদেশের দিকে। নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, ভোটগ্রহণ নির্বিঘ্ন করতে সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে। প্রতিটি কেন্দ্রে পৌঁছে গেছে ব্যালট পেপারসহ প্রয়োজনীয় সামগ্রী।
রাজনৈতিক দলগুলোও শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত প্রচারণা চালিয়েছে তুলনামূলক শান্ত ও সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে। নির্বাচন ঘিরে যে উৎসবমুখর আবহ তৈরি হয়েছে, তা দীর্ঘদিন পর দেশের রাজনীতিতে এক ইতিবাচক বার্তা দিচ্ছে।
দীর্ঘ গণতন্ত্রহীনতার ইতিহাস
বাংলাদেশ দীর্ঘ প্রায় দুই দশক ধরে কার্যত গণতান্ত্রিক শাসন থেকে বঞ্চিত ছিল।
২০০৬ সালের ১/১১-এর জরুরি সরকারের পর থেকেই নির্বাচনী ব্যবস্থা ধ্বংস হতে থাকে।
২০১৪ সালের ‘বিনা ভোটের নির্বাচন’,
২০১৮ সালের ‘রাতের ভোট’,
এবং ২০২৪ সালের ‘ডামি নির্বাচন’—
এসব নির্বাচনকে বিশ্লেষকরা গণতন্ত্রের নামে প্রহসন বলেই আখ্যা দিয়েছেন।
এই সময়কালে নির্বাচনী ব্যবস্থা, বিচার বিভাগ ও প্রশাসনের উপর রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়, যা দেশে কর্তৃত্ববাদী শাসনের পথ প্রশস্ত করে।
জুলাই অভ্যুত্থান ও অন্তর্বর্তী সরকার
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে ৩৬ দিনের ছাত্র-গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে ফ্যাসিবাদী শাসনের পতন ঘটে। শেখ হাসিনা দেশ ত্যাগ করলে নোবেলজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে।
দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই অন্তর্বর্তী সরকার একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি দেয়। সেই প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন হিসেবেই আজকের নির্বাচনকে দেখা হচ্ছে।
সংসদ নির্বাচন ও গণভোট—একই দিনে ঐতিহাসিক ঘটনা
এবারের নির্বাচন কয়েকটি কারণে ব্যতিক্রমী—
- একই দিনে সংসদ নির্বাচন ও সংবিধান সংস্কার সংক্রান্ত গণভোট
- দুটি ভিন্ন রঙের ব্যালট পেপার
- প্রায় ৪ কোটি তরুণ ভোটার, যা মোট ভোটারের এক-তৃতীয়াংশ
- সিসিটিভি, বডি-ওর্ন ক্যামেরা ও ড্রোন নজরদারি
নির্বাচন কমিশনের তথ্যমতে, প্রায় এক লাখ সেনাসদস্যসহ মোট ৯ লাখ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে।
ঈদের মতো ভোটের আমেজ
নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে এক ধরনের ঈদের আমেজ বিরাজ করছে। ভোটারদের নির্বিঘ্নে বাড়ি গিয়ে ভোট দেওয়ার সুযোগ দিতে টানা চার দিনের ছুটির ব্যবস্থা করা হয়েছে।
বাসটার্মিনাল, লঞ্চঘাট ও রেলস্টেশনে দেখা যাচ্ছে ঈদের মতো ভিড়। বিশেষ করে তরুণ ভোটাররা প্রথমবার ভোট দিতে পেরে দারুণ উচ্ছ্বসিত।
রাষ্ট্রচিন্তকদের দৃষ্টিভঙ্গি
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ও রাষ্ট্রচিন্তক প্রফেসর মাহবুব উল্লাহ বলেন,
নির্বাচন দৃশ্যত ভালো হলেও প্রকৃত গণতন্ত্র নিশ্চিত হবে কি না, তা নির্ভর করবে নির্বাচনের পর ক্ষমতাসীনদের আচরণের ওপর।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী মনে করেন,
নির্বাচন গণতন্ত্রে উত্তরণের প্রথম ধাপ মাত্র। গণতন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পাবে তখনই, যখন জবাবদিহি, সুশাসন ও মানবাধিকার নিশ্চিত হবে।
অতীতের নির্বাচনি প্রহসনের তদন্ত
জাতীয় নির্বাচন তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে,
২০১৪-২০২৪ সালের নির্বাচনগুলো ছিল পরিকল্পিত নির্বাচন প্রকৌশলের ফল।
প্রশাসন, পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থাকে ব্যবহার করে ভোটের ফল নির্ধারণ করা হয়েছিল।
এই প্রতিবেদনে নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতা খর্ব হওয়ার চিত্রও তুলে ধরা হয়।
গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সন্ধিক্ষণ
বিশ্লেষকদের মতে, ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি সন্ধিক্ষণ।
এটি কেবল সরকার পরিবর্তনের ভোট নয়, বরং—
- ভোটাধিকার পুনরুদ্ধার
- রাষ্ট্র সংস্কারের সূচনা
- গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার সুযোগ
সব মিলিয়ে এই নির্বাচন বাংলাদেশের জন্য এক ঐতিহাসিক পরীক্ষা।