কুয়েটের সংঘর্ষের জেরে ছাত্র রাজনীতির ঐক্যে ফাটল
দিগন্ত জার্নাল ডেস্ক:
খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (কুয়েট) সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার ঘটনাকে কেন্দ্র করে ছাত্রদল ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মধ্যে উত্তেজনা বেড়েছে। মঙ্গলবারের সংঘর্ষে অর্ধশতাধিক শিক্ষার্থী আহত হন, দেশি অস্ত্র ও লাঠিসোটা নিয়ে কয়েক ঘণ্টা ধরে চলা সহিংসতায় ক্যাম্পাস উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
সংঘর্ষের কারণ ও পাল্টাপাল্টি অভিযোগ
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন অভিযোগ করেছে, ছাত্রদল তাদের সংগঠনের কর্মীদের ওপর হামলা চালিয়েছে এবং ক্যাম্পাসে নিজেদের আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা করছে। বিপরীতে, ছাত্রদল বলছে, তারা যখন সদস্য সংগ্রহ কর্মসূচি চালাচ্ছিল, তখন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের একাংশ তাদের বাধা দিলে সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়। ছাত্রদলের দাবি, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ক্যাম্পাসগুলোতে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে এই উত্তেজনার জন্ম দিয়েছে।
ছাত্র রাজনীতির অভ্যন্তরীণ বিভক্তি ও বিশ্লেষকদের মতামত
বিশ্লেষকদের মতে, জুলাই-আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানে ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের বিভিন্ন ছাত্র সংগঠন একসঙ্গে লড়াই করলেও এখন তারা পরস্পরের প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে শিক্ষাঙ্গনে নতুন করে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। তারা মনে করেন, এ বিভক্তি পুরো জাতির জন্য দুর্ভাগ্যজনক এবং এর ফলে তৃতীয় পক্ষের হস্তক্ষেপের আশঙ্কা রয়েছে।
আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল ফেসবুকে মন্তব্য করেছেন, “ভাইদের যখন দেখি একে অন্যের রক্তের নেশায় মাতে, তখন সত্যিকারের ভয় লাগে। ৬ মাস আগেও একসঙ্গে লড়াই করা ছাত্ররা আজ মুখোমুখি হচ্ছে—এটা কোনোভাবেই ভালো কিছু নয়।”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পাল্টাপাল্টি বিক্ষোভ
কুয়েটের সংঘর্ষের জেরে মঙ্গলবার রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন বিক্ষোভ সমাবেশ করে। একই সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাস-এর পাশে ছাত্রদলও প্রতিবাদ সমাবেশ করে। এসব কর্মসূচিতে একে অপরের বিরুদ্ধে কঠোর বক্তব্য দেওয়া হয়। ফলে ক্যাম্পাসে নতুন করে সংঘর্ষের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
সংগঠনগুলোর প্রতিক্রিয়া
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মুখ্য সংগঠক আবদুল হান্নান মাসউদ বলেছেন, “একটি ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের মতো আচরণ করছে। সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালিয়ে তাদের দমন করতে চাইছে।” তিনি দাবি করেন, “এই সন্ত্রাস বন্ধ করতে হলে দোষীদের বিচারের আওতায় আনতে হবে এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে লেজুড়বৃত্তিক ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ করতে হবে।”
ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছির পাল্টা অভিযোগ করে বলেছেন, “কুয়েটে ছাত্রদল ক্যাম্পাসের বাইরে ফর্ম বিতরণ করছিল, তখন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতারা হামলা চালায়।” তিনি বলেন, “ছাত্রদলের সাংবিধানিক অধিকার রয়েছে রাজনীতি করার। কিন্তু কেউ পরিকল্পিতভাবে সংঘর্ষ বাঁধানোর চেষ্টা করছে।”
বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি জাহিদুল ইসলাম বলেন, “কুয়েটে বহিরাগত যুবদল ও বিএনপির নেতাকর্মীদের নিয়ে ছাত্রদল ছাত্রলীগের মতো হামলা চালিয়েছে।” তিনি সবাইকে ‘জুলাই স্পিরিট’ ধরে রাখার আহ্বান জানান।
ছাত্র সংসদ নির্বাচনের দাবি
শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশ মনে করছে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্র সংসদ নির্বাচন না হওয়ায় সংঘাত বাড়ছে। ঢাবির শিক্ষার্থী আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, “আমরা যখন জুলাই-আগস্ট আন্দোলন করেছি, তখন ছাত্র সংসদ নির্বাচনের দাবি জানিয়েছি। কিন্তু অভ্যুত্থানের পরও এ নির্বাচন হয়নি, বরং ক্যাম্পাসে সন্ত্রাসী রাজনীতি ফিরে আসছে।”
বিশ্লেষকরা বলছেন, সংঘাত এড়াতে ছাত্র সংগঠনগুলোর ‘প্যারেন্ট সংগঠন’গুলোর সিনিয়র নেতাদের দ্রুত হস্তক্ষেপ করা উচিত। না হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।