ফ্যাসিস্ট আমলে নিয়োগ পাওয়া অনেক পুলিশ সদস্য এখনও অপতৎপরতায় লিপ্ত - দিগন্ত জার্নাল

ফ্যাসিস্ট আমলে নিয়োগ পাওয়া অনেক পুলিশ সদস্য এখনও অপতৎপরতায় লিপ্ত

দিগন্ত জার্নাল ডেস্ক:

ফ্যাসিস্ট আমলে নিয়োগ পাওয়া অনেক পুলিশ সদস্য এখনো অপতৎপরতায় লিপ্ত। দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আজকাল এতটাই অবনতির দিকে চলে যাচ্ছে, যে সাধারণ মানুষ প্রতি দিনেই পুলিশ বাহিনীর কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। অবশেষে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির এই অবনতি নিয়ে বিশ্লেষকদের অনেকেই সন্দেহ প্রকাশ করছেন। তাদের মতে, পুলিশ বাহিনীর পেশাদারিত্বের অভাব এবং বাহিনীতে অবস্থানরত কিছু সদস্যের গাফিলতি মূল কারণ। বিশেষ করে, পুলিশ বাহিনীতে এক ধরনের বিশেষ দলীয় প্রভাব রয়েছে, যারা সরকারের নির্দিষ্ট আদর্শে বিশ্বাসী এবং নিজেদের স্বার্থে কাজে লিপ্ত। এর ফলস্বরূপ, এই বাহিনীর কিছু সদস্য জনগণের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে আগ্রহী নন।

একটি বড় অংশের বিশ্লেষকরা বলছেন, ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের ১৫ বছরের শাসনামলে পুলিশ বাহিনীতে আওয়ামীপন্থিদের নিয়োগের কারণে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। তাদের মতে, গতবছরের গণ-অভ্যুত্থান সময়ের পুলিশ বাহিনীর মধ্যে ছিল দলের সদস্যদের এক ধরনের প্রভাব, যারা ছাত্র-জনতার ওপর ভয়ঙ্কর অত্যাচার চালিয়েছিল। এইভাবে পুলিশ বাহিনীর একটি বড় অংশ জনগণের মধ্যে আস্থা হারিয়েছে এবং অপরাধ নিয়ন্ত্রণে সফল হতে পারছে না। বিশেষজ্ঞরা দাবি করছেন যে, তৃতীয় পক্ষের ষড়যন্ত্রের কারণে পুলিশ অনেক সময় নিষ্ক্রিয় ভূমিকা পালন করছে, যা পরিস্থিতি আরও খারাপ করে তুলছে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, অপরাধীরা এখন যতটা সক্রিয়, পুলিশ ততটাই নিষ্ক্রিয়। দেশে অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে, যেখানে অপরাধীরা পুলিশ বাহিনীর ভীতি না পেয়ে তাদের কার্যক্রম আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। অপরাধীদের দৌরাত্ম্য শুধু বাড়ছে না, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও যথাযথভাবে সক্রিয় হতে পারছে না। পুলিশ বাহিনীর অনেক সদস্য এখনো পূর্বের প্রশাসনিক সংকীর্ণতা, দলীয় অঙ্গীকার এবং ক্ষমতার প্রভাবের অধীনে কাজ করছে, যার ফলে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসছে না। প্রাক্তন আইজিপি নূরুল হুদা জানাচ্ছেন, পুলিশের ওপর অতীতে অত্যন্ত বড় ধরনের চাপ ছিল, যা এখনও কাটিয়ে উঠতে পারছে না। তিনি আরও বলেন, অনেক পুলিশ সদস্য নিজেদের অক্ষমতা বা বিশেষ কারণের কারণে নিষ্ক্রিয় রয়েছেন, কিন্তু এসব সদস্যদের চিহ্নিত করে উপযুক্ত পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। অপরাধ বাড়ানোর পেছনে মূলত দেশের মুদ্রাস্ফীতি এবং জনগণের অব্যাহত অভাব কাজ করছে, যার কারণে অনেক মানুষ অপরাধে জড়াচ্ছে। তিনি আরও বলেন, পুলিশের মধ্যে এখনো অনেক সদস্য ঘুস বাণিজ্য এবং হয়রানির শিকার হওয়ার কারণে তাদের পেশাদারিত্বের অভাব রয়েছে, যা বাহিনীর কার্যকারিতায় সমস্যা সৃষ্টি করছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানাচ্ছে, পুলিশের নানা অভিযানে কিছু সফলতা থাকলেও মূলত, বাহিনী সক্রিয় না থাকায় পরিস্থিতি স্থিতিশীল হচ্ছে না। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, যে সমস্ত অপরাধী গ্রুপ বা গ্যাং গত এক বছরে জামিনে মুক্ত হয়ে পুনরায় অপরাধে জড়িয়েছে, তাদের প্রতি পুলিশ আরও নজর দিতে হবে। গ্যাংভিত্তিক সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড, ছিনতাই এবং ডাকাতির ঘটনা বৃদ্ধি পাওয়ার সাথে সাথে পুলিশের উচিত কঠোর তৎপরতা গ্রহণ করা। তাদের মতে, দলীয় রাজনীতি বা বাহিনীর অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা অপারেশনগুলোতে প্রভাব ফেলছে, যা অপরাধীদের দৌরাত্ম্য কমাতে সহায়তা করছে না।

এ বছর জানুয়ারি মাসে সারা দেশে ৭১টি ডাকাতি, ১৭১টি ছিনতাই, ২৯৪টি খুন এবং ১০৫টি অপহরণসহ একাধিক অপরাধের ঘটনা ঘটেছে। বিশেষত ঢাকা মহানগরীসহ বিভিন্ন অঞ্চলে অপরাধের মাত্রা উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, পুলিশ বাহিনীর দুর্বলতা এবং অপরাধী গ্যাংগুলির সক্রিয়তা একে অপরকে সমর্থন করছে, যা জনজীবনে তীব্র উদ্বেগ সৃষ্টি করছে।

ঢাকার গাবতলী থেকে রাজশাহীর উদ্দেশ্যে ছেড়ে যাওয়া একটি বাসে যাত্রীবেশে থাকা ডাকাতদল গত ১৭ ফেব্রুয়ারি রাত ১০টার দিকে বাসের নিয়ন্ত্রণ নেয়। তিন ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে তারা বাসে তাণ্ডব চালিয়ে যাত্রীদের লুটপাট করে এবং দুই নারী যাত্রীকে শ্লীলতাহানি করে। এর তিন দিন পর ২১ ফেব্রুয়ারি টাঙ্গাইলের মির্জাপুর থানায় মামলা করা হয়, তবে এখনও কোনো উল্লেখযোগ্য অভিযানের খবর পাওয়া যায়নি।

এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে সরকার এবং পুলিশ বাহিনীর করণীয় বিষয়টি অত্যন্ত স্পষ্ট। পুলিশ বাহিনীর কার্যকারিতা বৃদ্ধি, পেশাদারিত্বের উন্নয়ন এবং অপরাধীদের বিরুদ্ধে আরও কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। তাছাড়া জনসাধারণকে পুলিশের কাজে সহযোগিতা করতে উদ্বুদ্ধ করাও অপরিহার্য। পুলিশ বাহিনী যদি তার দায়িত্ব পালনে পুরোপুরি নিষ্ক্রিয় থাকে, তবে তা দেশের নিরাপত্তা এবং জনগণের আস্থা সংকটে ফেলবে।

an adbox will go here