জাতীয় নাগরিক পার্টির আত্মপ্রকাশ ও ঘোষণাপত্র - দিগন্ত জার্নাল

জাতীয় নাগরিক পার্টির আত্মপ্রকাশ ও ঘোষণাপত্র

দিগন্ত জার্নাল ডেস্ক:

জুলাই-আগস্ট আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া তরুণদের নতুন রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) আত্মপ্রকাশ করেছে। শুক্রবার সন্ধ্যায় রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে এক সমাবেশে দলের আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম ঘোষণাপত্র পাঠ করেন। তিনি বলেন, এই দল গণতন্ত্র, সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করবে।

স্বাধীনতা-পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতা

ঘোষণাপত্রে বলা হয়, বাংলাদেশ হাজার বছরের ঐতিহ্য ও সংগ্রামের পথ ধরে এগিয়ে এসেছে। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন, পাকিস্তানি দুঃশাসন ও ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের পর স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হলেও প্রকৃত গণতন্ত্র ও সাম্য নিশ্চিত করা যায়নি।

১৯৯০ সালে ছাত্র-জনতা বুকের তাজা রক্ত দিয়ে সামরিক স্বৈরাচারের পতন ঘটায়। কিন্তু তারপরও দেশে প্রকৃত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়নি। বরং বিগত ১৫ বছর দেশে একটি ফ্যাসিবাদী শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, যেখানে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয় স্বার্থে ব্যবহার করে জনগণের অধিকার হরণ করা হয়েছে।

জুলাই ২০২৪ গণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপট

ঘোষণাপত্রে বলা হয়, জুলাই ২০২৪-এ ছাত্র-জনতার অভূতপূর্ব আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে ফ্যাসিবাদী সরকারের পতন ঘটে। তবে এই বিপ্লব কেবল সরকার পরিবর্তনের জন্য ছিল না, বরং রাষ্ট্রের ফ্যাসিবাদী কাঠামো বিলোপের মাধ্যমে একটি নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থার আকাঙ্ক্ষা থেকেই জনগণ এই আন্দোলনে অংশ নেয়। সেই লক্ষ্যেই জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেওয়া হয়, যা হবে একটি গণতান্ত্রিক, সমতাভিত্তিক ও জনগণের প্রতিনিধিত্বকারী রাজনৈতিক দল।

সেকেন্ড রিপাবলিক প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার

নাহিদ ইসলাম বলেন, জুলাই ২০২৪ গণঅভ্যুত্থান আমাদের সেকেন্ড রিপাবলিক প্রতিষ্ঠার লড়াই সূচনা করেছে। নতুন সংবিধান প্রণয়নের মাধ্যমে সাংবিধানিক স্বৈরতন্ত্রের সব সম্ভাবনার অবসান ঘটাতে হবে। এ লক্ষ্যে গণপরিষদ নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন সংবিধান প্রণয়ন এনসিপির অন্যতম প্রাথমিক লক্ষ্য।

তিনি আরও বলেন, জাতীয় স্বার্থ সুরক্ষায় শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে। রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে পুনর্গঠন এবং তাদের গণতান্ত্রিক চরিত্র বজায় রাখা হবে। এর মাধ্যমেই একটি পরিপূর্ণ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা সম্ভব।

রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও নীতিমালা

নাহিদ ইসলাম বলেন, আমরা এমন একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তুলতে চাই যেখানে—

সমাজ ও রাষ্ট্রের সর্বস্তরে ঐক্য থাকবে, বিভেদ থাকবে না।

প্রতিশোধের বদলে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা হবে।

পরিবারতন্ত্রের বদলে মেধা ও যোগ্যতার মানদণ্ড প্রতিষ্ঠা করা হবে।

দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির কোনো স্থান থাকবে না।

তিনি বলেন, আমাদের সেকেন্ড রিপাবলিকে সমাজের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর কণ্ঠস্বরকে মূলধারায় তুলে আনা হবে। এখানে সাধারণ মানুষই হবে ক্ষমতার সর্বময় উৎস এবং তাদের গণতান্ত্রিক ও মৌলিক অধিকারের শক্তিশালী সুরক্ষা নিশ্চিত করা হবে।

অর্থনৈতিক নীতিমালা

নতুন দলের আহ্বায়ক বলেন, আমরা এমন একটি অর্থনীতি গড়ে তুলতে চাই যা হবে—

স্বনির্ভর ও আয়-বৈষম্যহীন।

প্রাণ-প্রকৃতি-পরিবেশের প্রতি সংবেদনশীল।

সম্পদ একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর হাতে পুঞ্জীভূত হবে না।

সম্পদের সুষম পুনর্বণ্টন হবে অর্থনীতির মূলনীতি।

বেসরকারি খাতের সিন্ডিকেট ও গোষ্ঠীস্বার্থ নিয়ন্ত্রণ করা হবে।

আঞ্চলিক সহযোগিতা ও আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্বের মাধ্যমে টেকসই অর্থনীতি গড়ে তোলা হবে।

সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থা

নাহিদ ইসলাম বলেন, আমরা একটি বহুত্বপূর্ণ ও সমৃদ্ধ সমাজ গড়ে তুলতে চাই যেখানে—

জাতিগত, সামাজিক, লিঙ্গীয় ও ধর্মীয় বৈচিত্র্য রক্ষা করা হবে।

দারিদ্র্য, বৈষম্য ও ক্ষমতার অপব্যবহার থেকে জনগণকে সুরক্ষা দেওয়া হবে।

রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিককে সমান গুরুত্ব দেওয়া হবে।

তিনি আরও বলেন, আমাদের লক্ষ্য একটি ন্যায্য ও সমতাভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা। এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য আমরা সবাই ঐক্যবদ্ধ হয়ে এগিয়ে যাব।

সামনের পথচলা ও সংগ্রাম

নাহিদ ইসলাম বলেন, জুলাই ২০২৪ গণঅভ্যুত্থান শুধু একটি সরকারের পতন ঘটানোর আন্দোলন ছিল না, এটি ভবিষ্যৎ গঠনের শপথও। তিনি বলেন, এখনই সময় নতুন স্বপ্ন দেখার, নতুন পথচলার এবং নতুন বাংলাদেশ গড়ার।

তিনি জনগণের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন—
“চলুন, ঐক্যবদ্ধ হয়ে আমাদের কাঙ্ক্ষিত সেকেন্ড রিপাবলিক প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে এগিয়ে যাই। আমাদের দেশ, আমাদের অধিকার, আমাদের ভবিষ্যৎ— আমাদের সেকেন্ড রিপাবলিক কোনো অধরা স্বপ্ন নয়, এটি আমাদের প্রতিজ্ঞা!”

an adbox will go here