এক মানবাধিকার অগ্রদূতের জীবন ও কর্ম: পিনাকী ভট্টাচার্য - দিগন্ত জার্নাল

এক মানবাধিকার অগ্রদূতের জীবন ও কর্ম: পিনাকী ভট্টাচার্য

দিগন্ত জার্নাল ডেস্ক:

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক সি আর আবরার বাংলাদেশের মানবাধিকার আন্দোলনের এক অগ্রদূত। ১৯৫২ সালে গোপালগঞ্জ জেলার পাইকান্দিতে জন্ম নেওয়া এই শিক্ষাবিদ শৈশব ও কৈশোর কাটিয়েছেন ঢাকার ঐতিহ্যবাহী ওয়ারী এলাকায়। তাঁর নানা ছিলেন ফরিদপুরের বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ আব্দুল্লাহ জহিরুদ্দিন উদ্দিন লাল মিয়া এবং বাবা ছিলেন একজন সফল ব্যবসায়ী। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও প্রগতিশীল আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে আহমদ শরীফ, সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, আহমদ ছফা, হুমায়ুন কবির, আবুল কাশেম ফজলুল হক প্রমুখের সান্নিধ্যে এসে তিনি ১৯৭০ সালে লেখক সংগ্রাম শিবির প্রতিষ্ঠা করেন, যা স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ লেখক শিবির হিসেবে পরিচিত হয়। ১৯৭৮ সালে বদরুদ্দিন উমর ও অধ্যাপক আবরার সংগঠনের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৭৩ সালে দেশে রক্ষীবাহিনীর দমন-পীড়নের সময় মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষায় বদরুদ্দিন উমর, কবি সিকান্দার আবু জাফর, ফয়েজ আহমেদ, এনায়েত উল্লাহ খানসহ অন্যান্যদের সঙ্গে তিনি ‘মৌলিক অধিকার সংরক্ষণ এবং আইন সাহায্য কমিটি’ গঠন করেন। এছাড়া, ১৯৭৪ সালে দেশে দুর্ভিক্ষ দেখা দিলে ‘দুর্ভিক্ষ প্রতিরোধ কমিটি’র সদস্য হিসেবে ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনা করেন। একতরফা পানি প্রত্যাহারের প্রতিবাদে ১৯৭৫ সালে মওলানা ভাসানীর ডাকে অনুষ্ঠিত ফরাক্কা লং মার্চে তিনি সংগঠক হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

তিনি মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিকে মানবিক শাখায় মেধাতালিকায় স্থান অর্জন করেন। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আন্তর্জাতিক সম্পর্কে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন এবং পরবর্তীতে যুক্তরাজ্যের সাসেক্স বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স ও অস্ট্রেলিয়ার গ্রিফিথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৯১ সালে বিদেশে পড়াশোনা শেষে দেশে ফিরে এসে তিনি শিক্ষকতায় আত্মনিয়োগ করেন। তবে প্রচলিত শিক্ষক রাজনীতিতে জড়ানোর পরিবর্তে তিনি গবেষণা ও মানবাধিকার রক্ষায় মনোনিবেশ করেন। তিনি Refugee and Migratory Movements Research Unit (রামরু) প্রতিষ্ঠা করেন, যা অভিবাসী শ্রমিকদের অধিকার রক্ষায় কাজ করে। অধ্যাপক আবরার বাংলাদেশে ক্যাম্পে বসবাসরত উর্দুভাষী জনগোষ্ঠীর নাগরিকত্ব নিশ্চিত করতে দীর্ঘদিন কাজ করেছেন। তাঁর প্রচেষ্টায় ২০০৮ সালে উচ্চ আদালতের রায়ের মাধ্যমে উর্দুভাষী জনগোষ্ঠী বাংলাদেশি নাগরিকত্ব লাভ করে। ১৯৯০ সালে অভিবাসন সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক কনভেনশনে বাংলাদেশ সরকারের স্বীকৃতি আদায়ে তাঁর সংগঠনের ভূমিকা ছিল অপরিসীম। অভিবাসী শ্রমিকদের অধিকার রক্ষায় কাজ করতে গিয়ে তিনি আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ ভাঙার উদ্যোগ নেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে সমন্বয় করে ওয়েস্টার্ন ইউনিয়নের একচ্ছত্র আধিপত্য ভেঙে দিয়ে তিনি রেমিট্যান্স প্রবাহকে উন্মুক্ত করেন, ফলে অভিবাসী শ্রমিকদের পাঠানো অর্থের পরিমাণ বৃদ্ধি পায়। ২০২৪ সালেই তিনি প্রতারিত অভিবাসী শ্রমিকদের জন্য আইনি সালিশের মাধ্যমে সাত কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ আদায়ে সক্ষম হন।

কোভিড মহামারির সময় দেশে ফিরে আসা প্রবাসী শ্রমিকদের বিরুদ্ধে মামলা দিয়ে আটক করা হলে অধ্যাপক আবরার আদালতে রিট পিটিশন করেন এবং তাদের মুক্তির ব্যবস্থা করেন। একইভাবে, দেশে অবৈধভাবে প্রবেশ করা রোহিঙ্গা শরণার্থীদের আটকের বিরুদ্ধে তিনি উচ্চ আদালতে মামলা করেন এবং তাদের মুক্তির আদেশ করিয়ে আনেন। অধ্যাপক আবরার আজীবন মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও মানবাধিকারের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। বিগত এক দশকে তিনি ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা, সীমান্ত হত্যা, মানবাধিকার লঙ্ঘনসহ বিভিন্ন বিষয়ে দেড় শতাধিক নিবন্ধ লিখেছেন, যা দেশ-বিদেশে মানবাধিকার পরিস্থিতি তুলে ধরতে সহায়ক হয়েছে। অধ্যাপক সি আর আবরার শুধু একজন শিক্ষকই ছিলেন না, তিনি ছিলেন গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার একজন অক্লান্ত যোদ্ধা। তাঁর মৃত্যুতে বাংলাদেশ একজন সৎ, নির্ভীক এবং মানবিক চিন্তাবিদকে হারালো, যার শূন্যতা পূরণ করা কঠিন হবে।

an adbox will go here