কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে খাদ্য সংকটের কারণে সহিংসতা বৃদ্ধি - দিগন্ত জার্নাল

কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে খাদ্য সংকটের কারণে সহিংসতা বৃদ্ধি

দিগন্ত জার্নাল ডেস্ক :

কক্সবাজারের টেকনাফ ও উখিয়ার ৩৩টি রোহিঙ্গা ক্যাম্পে চলমান অস্ত্র ও মাদক ব্যবসার আধিপত্যের লড়াই যেন এক স্থায়ী সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। এই সহিংসতার মূল কারণ হিসেবে উঠে এসেছে বিভিন্ন গ্রুপের মধ্যে শত্রুতা এবং ব্যবসার ভাগ-বাঁটোয়ারা। গত চার বছরে আটটি গ্রুপের মধ্যে সংঘটিত সহিংসতায় অন্তত ২০২ জন নিহত হয়েছেন, যার মধ্যে আরসা, আরএসও, এআরএ-র মতো সংগঠনগুলির মধ্যে সংঘর্ষে ঘটে সবচেয়ে বেশি হত্যাকাণ্ড। সম্প্রতি গত ৮ মার্চ উখিয়া রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সংঘর্ষের পর এক যুবক মোহাম্মদ রফিক (৩৩) নিহত হয়েছেন।

এ পরিস্থিতিতে জাতিসংঘ খাদ্য সহায়তা কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যার ফলে ক্যাম্পগুলোতে খাদ্য সংকট চরম আকার ধারণ করতে পারে। ১ এপ্রিল থেকে এই নতুন সহায়তা পরিকল্পনা কার্যকর হবে, যেখানে প্রতি রোহিঙ্গার জন্য সহায়তা কমিয়ে ১২.৫ ডলারের পরিবর্তে ৬ ডলার করা হবে। বর্তমান পরিস্থিতি অনুযায়ী, এই খাদ্য সংকট ক্যাম্পগুলোর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।

গ্রুপগুলোর মধ্যে সংঘর্ষের মূল চালিকাশক্তি হল অস্ত্র এবং মাদক ব্যবসা। মিয়ানমার থেকে অস্ত্র সরবরাহ ও কক্সবাজারের মহেশখালীসহ বিভিন্ন স্থান থেকে অস্ত্র তৈরি হচ্ছে। ক্যাম্পগুলোতে ইয়াবা, আইস-ক্রিস্টাল মেথ সহ বিপুল পরিমাণ মাদক দ্রব্যের চোরাচালান চলছে, যা এই সহিংসতা বাড়াচ্ছে। গত সাত মাসে ৩১টি মাদক মামলায় ৩৫ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে, এবং উদ্ধার করা হয়েছে ৭০,০০০ পিস ইয়াবা।

শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (অতিরিক্ত সচিব) মিজানুর রহমান জানিয়েছেন, খাদ্য সংকটের কারণে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আরও অবনতির আশঙ্কা রয়েছে। বর্তমানে জাতিসংঘ রোহিঙ্গাদের জন্য ১২.৫ ডলার সহায়তা দিচ্ছে, কিন্তু আগামী এপ্রিল থেকে এটি কমিয়ে ৬ ডলার করা হবে, যা ক্যাম্পে খাদ্য সংস্থানকে সংকুচিত করবে। এর ফলে, ক্যাম্পগুলোর মধ্যে অপরাধ প্রবণতা আরও বৃদ্ধি পেতে পারে, যেহেতু অনেক রোহিঙ্গা দুর্ভিক্ষের মধ্যে পড়বে।

এছাড়া, গত এক বছরে ৬৫,০০০ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে, যা স্থানীয় জনগণের মধ্যে আরও অস্বস্তির সৃষ্টি করছে। আরাকান আর্মির নির্যাতন এবং মানবিক কারণে অনুপ্রবেশের এই প্রবাহ থামানো যাচ্ছে না, এবং এটি ভবিষ্যতে ভূরাজনৈতিক দিক থেকেও বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়াতে পারে।

এই পরিস্থিতি মোকাবিলা করা একদম সহজ হবে না, কারণ ক্যাম্পের ভিতরে থাকা যুবকদের মধ্যে অনেকেই সহিংসতার শিকার হয়েছেন, তাদের মা-বোনের ধর্ষণ এবং বাবার হত্যার ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছেন। এর ফলে, তাদের মধ্যে অপরাধ প্রবণতা বেড়েছে, এবং তাদের নিয়ন্ত্রণে রাখা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং হয়ে উঠেছে।

রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং ক্যাম্পগুলোতে আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে বর্তমানে আইন প্রয়োগকারী বাহিনীর বিভিন্ন ইউনিট কাজ করছে। তবে, তাদের কার্যক্রম সীমিত এবং স্থানীয় কিছু অপরাধী চক্রের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক থাকার কারণে মাদক ও অস্ত্র প্রবাহ থামানো সম্ভব হচ্ছে না।

এফডিএমএন ডিআইজি প্রলয় চিসিম জানিয়েছেন, সীমান্তে দুর্বল নিরাপত্তার কারণে মিয়ানমার থেকে অস্ত্র ও মাদক আসছে, এবং স্থানীয় অপরাধীরা এতে সহযোগিতা করছে। তাদের মতে, রোহিঙ্গাদের মধ্যে মানবিক কারণে কিছু সংখ্যক শরণার্থী ঢুকছে, তবে তাদের সংখ্যা বাড়ার কারণে স্থানীয়দের জন্য সমস্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, যদি রোহিঙ্গাদের সংখ্যা আরও বৃদ্ধি পায়, তবে তা ভবিষ্যতে কক্সবাজার অঞ্চলের জন্য একটি বড় সমস্যা হয়ে উঠতে পারে। এটি শুধুমাত্র আইনশৃঙ্খলার জন্য নয়, পরিবেশগত দিক থেকেও বিপজ্জনক হতে পারে, কারণ পাহাড় কাটা এবং বন ধ্বংসের ফলে বড় আকারের পরিবেশগত ক্ষতি হয়েছে।

এই পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হলে, রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবসন ছাড়া কোনো সমাধান সম্ভব নয়, এবং এটি একটি বড় ভূরাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।

an adbox will go here