প্রধান উপদেষ্টার চীন সফর: কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব বৃদ্ধি - দিগন্ত জার্নাল

প্রধান উপদেষ্টার চীন সফর: কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব বৃদ্ধি

দিগন্ত জার্নাল ডেস্ক:

বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. ইউনূসের আসন্ন চীন সফরকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন, শুধু বাংলাদেশের জনগণই নয়, যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতসহ বিভিন্ন প্রভাবশালী দেশ চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে তার বৈঠকের ওপর গভীর নজর রাখছে। ভূরাজনৈতিক ও কৌশলগত নানা কারণে এই বৈঠক বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে, বিশেষ করে যখন এক সপ্তাহ পর ব্যাংককে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে অধ্যাপক ইউনূসের বৈঠকের সূচি রয়েছে।

চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন সম্প্রতি এক মন্তব্যে জানিয়েছেন, এই সফর থেকে ‘গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা’ আসতে পারে। সাংবাদিকরা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘অপেক্ষা করুন এবং দেখুন। আমরা এখনো বিষয়টি নিয়ে কাজ করছি।’ বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এটি চীনের নতুন কোনো বড় বিনিয়োগ বা অর্থনৈতিক সহযোগিতার ইঙ্গিত হতে পারে। তবে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন জানিয়েছেন, সফরে কোনো চুক্তি সই হবে না, তবে কয়েকটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষর হতে পারে।

এসব সমঝোতার মধ্যে চীনের কারখানাগুলো বাংলাদেশে স্থানান্তর, চীনা বিনিয়োগ, অবকাঠামো উন্নয়ন, সামরিক সহযোগিতা ও রোহিঙ্গা সংকট সংক্রান্ত বিষয়গুলো বিশেষ গুরুত্ব পেতে পারে। চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের আমন্ত্রণে বোয়াও ফোরাম ফর এশিয়ায় যোগদানের লক্ষ্যে প্রধান উপদেষ্টা আগামীকাল চীন যাচ্ছেন। বোয়াও ফোরামকে এশিয়ার দাভোস হিসেবে বিবেচনা করা হয়, যেখানে বিভিন্ন দেশের শীর্ষ নেতারা এবং বিশ্বের জায়ান্ট ফার্মগুলোর প্রধান নির্বাহীরা অংশ নেন।

তবে এবারের সফরকে প্রধান উপদেষ্টার প্রথম দ্বিপক্ষীয় বিদেশ সফর ঘোষণা করা হয়েছে, যার ফলে এটি আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সফরকালে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক ছাড়াও বিভিন্ন বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহীদের সঙ্গে বৈঠক করবেন তিনি। সফরে চীনের রাষ্ট্রপতির পাঠানো বিশেষ বিমানে হাইনান ও বেইজিং যাবেন প্রধান উপদেষ্টা।

বাংলাদেশে চীনের সাবেক রাষ্ট্রদূত মাহবুব উজ জামান মনে করছেন, এই সফরকালে চীন বাংলাদেশের কাছে জানতে চাইতে পারে, তার প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক কী ধরনের। বিশেষ করে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের ভূরাজনৈতিক কৌশল ও বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটের আলোকে চীন-বাংলাদেশ সম্পর্ক কোন দিকে অগ্রসর হচ্ছে, সে বিষয়ে আলোচনা হতে পারে।

তিস্তা প্রকল্পের জন্য চীনের অর্থায়ন নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা চলছে। তবে প্রতিবেশী ভারতের উদ্বেগের কারণে এই সফরে প্রকল্পের অগ্রগতি নিয়ে চূড়ান্ত কোনো ঘোষণা আসবে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশ একদিকে চীনের কাছ থেকে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের নিশ্চয়তা চাইবে, অন্যদিকে প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে ভারসাম্য রক্ষার কৌশল গ্রহণ করবে।

বাংলাদেশের পক্ষ থেকে রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে চীনের গঠনমূলক ও ইতিবাচক ভূমিকার আহ্বান জানানো হতে পারে। বাংলাদেশ আগামী সেপ্টেম্বরে আন্তর্জাতিক রোহিঙ্গা সম্মেলন আয়োজনের পরিকল্পনা করছে, যা নিয়েও আলোচনা হতে পারে। বাংলাদেশ চীনকে যৌথ উদ্যোগে শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ার আহ্বান জানিয়ে আসছে। কারণ, চীনের শুল্কমুক্ত সুবিধা বাংলাদেশের জন্য পর্যাপ্ত নয়, বরং যৌথ শিল্প কারখানা গড়ে তুলতে পারলে বাংলাদেশ আরও উপকৃত হবে।

চীন বর্তমানে বাংলাদেশের অন্যতম বড় অর্থনৈতিক সহযোগী দেশ। অবকাঠামো উন্নয়ন, বিশেষ করে সেতু, কনভেনশন সেন্টারসহ বিভিন্ন প্রকল্পে চীনের অর্থায়ন অব্যাহত আছে। এবারের সফরেও চীন বাংলাদেশকে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের বিষয়ে আশ্বাস দিতে পারে। প্রেস সচিব শফিকুল আলম জানিয়েছেন, চীন বাংলাদেশকে একটি ম্যানুফ্যাকচারিং হাবে পরিণত করতে চায়। এর মাধ্যমে বাংলাদেশে শিল্প বিপ্লব ঘটানোর পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে।

সাম্প্রতিক দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় চীনের সামরিক সহযোগিতা, এয়ারক্রাফট বিক্রি এবং অন্যান্য প্রতিরক্ষা বিষয়ক আলোচনা হয়েছে। নতুন সরকার গঠনের পর চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক কেমন হবে, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলেও আলোচনা চলছে। সফর শেষে চীন সরকারের সম্ভাব্য ঘোষণা কী হতে পারে, তা নিয়ে নানা জল্পনা চলছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এটি হতে পারে নতুন অর্থনৈতিক বিনিয়োগ, যৌথ শিল্প কারখানা, অবকাঠামো উন্নয়ন বা সামরিক সহযোগিতা সংক্রান্ত কোনো ঘোষণা। চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েনের বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে সবাই এখন অপেক্ষায় আছে, সফর শেষে কী চমক আসে।

an adbox will go here