স্বাধীনতা পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানে প্রধান উপদেষ্টার বক্তব্য
দিগন্ত জার্নাল ডেস্ক:
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধের উদ্দেশ্য ছিল একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা করা, যেখানে আইনের শাসন থাকবে, মানুষের মৌলিক মানবাধিকার নিশ্চিত হবে এবং একটি বৈষম্যহীন সমাজ গড়ে উঠবে। কিন্তু স্বাধীনতার এত বছর পরও দেশে ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়নি। দীর্ঘদিন ধরে জনগণ তাদের ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছে। দুর্নীতি, লুটপাট, গুম-খুনের রাজত্ব কায়েম করে দেশে এক ফ্যাসিবাদী শাসনব্যবস্থা চালু করা হয়েছে।
মঙ্গলবার সকালে রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে স্বাধীনতা পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন। এসময় তিনি স্বাধীনতা সংগ্রামের সব বীর শহীদ ও মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। তিনি বলেন, মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মত্যাগের কারণেই আজ আমরা একটি স্বাধীন রাষ্ট্র পেয়েছি। কিন্তু তাদের স্বপ্নের বাংলাদেশ কতটা বাস্তবায়িত হয়েছে, তা নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের শহীদ ও আহতদের স্মরণ করে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, তাদের আত্মত্যাগের মাধ্যমেই আমরা ‘নতুন বাংলাদেশ’ গড়ার স্বপ্ন দেখার সুযোগ পেয়েছি। এই সুযোগ আমাদের হাতছাড়া করা উচিত নয়। তিনি বলেন, আমাদের দেশ স্বাধীন হয়েছে, কিন্তু ন্যায়ের ভিত্তিতে পরিচালিত একটি রাষ্ট্র হিসেবে এখনো কাঙ্ক্ষিত অবস্থানে পৌঁছাতে পারিনি।
ড. ইউনূস বলেন, আজকের অনুষ্ঠান আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মরণোত্তর পুরস্কারের চেয়ে জীবদ্দশায় পুরস্কার পেলে যে আনন্দ পাওয়া যায়, তা ব্যক্তি, পরিবার ও দেশের জন্য অনন্য মর্যাদার। আমরা যাদের সম্মান জানাই, তারা যদি জীবিত থাকেন, তবে তারা নিজেদের কাজের স্বীকৃতি দেখে গর্ববোধ করতে পারেন। কিন্তু আমরা যদি তাদের বেঁচে থাকা অবস্থায় মূল্যায়ন না করি, তাহলে আমরা অকৃতজ্ঞ জাতি হিসেবে চিহ্নিত হবো।
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, আমাদের উচিত ভবিষ্যতে এমন একটি নিয়ম চালু করা, যাতে আমরা মরণোত্তর পুরস্কারের ক্ষেত্রে যথাযথ সিদ্ধান্ত নিয়ে জীবিত গুণীজনদের যথাসময়ে স্বীকৃতি দিতে পারি। জাতির জন্য যারা অসামান্য অবদান রেখেছেন, তাদের জীবদ্দশায় সম্মানিত করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। কারণ তাদের অর্জন কেবল তাদের ব্যক্তিগত নয়, পুরো জাতির গৌরবের অংশ।
তিনি আরও বলেন, স্বাধীনতা পুরস্কার শুধু একটি স্বীকৃতি নয়, এটি দেশের জন্য বিশেষ অবদান রাখা ব্যক্তিদের প্রতি জাতির কৃতজ্ঞতার প্রকাশ। পুরস্কারপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও বাংলাদেশকে পরিচিত করেছেন। তাদের কাজের স্বীকৃতি দেওয়া মানে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করা।
এ বছর ছয় জন বিশিষ্ট নাগরিককে মরণোত্তর স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত করা হয়েছে বলে জানান প্রধান উপদেষ্টা। তিনি বলেন, এরা সবাই বাংলার সূর্যসন্তান। তাদের অবদান জাতি চিরকাল শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে।
এর আগে জাতীয় পর্যায়ে গৌরবোজ্জ্বল ও কৃতিত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে সাতজন বিশিষ্ট ব্যক্তিকে ২০২৫ সালের স্বাধীনতা পুরস্কার প্রদান করা হয়। প্রধান উপদেষ্টা নিজ হাতে পুরস্কার তুলে দেন।
এবার স্বাধীনতা পুরস্কার প্রাপ্তরা হলেন—বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে অধ্যাপক জামাল নজরুল ইসলাম (মরণোত্তর), সাহিত্যে মীর আবদুস শুকুর আল মাহমুদ (মরণোত্তর), সংস্কৃতিতে নভেরা আহমেদ (মরণোত্তর), সমাজসেবায় স্যার ফজলে হাসান আবেদ (মরণোত্তর), মুক্তিযুদ্ধ ও সংস্কৃতিতে মোহাম্মদ মাহবুবুল হক খান ওরফে আজম খান (মরণোত্তর), শিক্ষা ও গবেষণায় বদরুদ্দীন মোহাম্মদ উমর এবং প্রতিবাদী তারুণ্যে আবরার ফাহাদ (মরণোত্তর)।
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, দেশের গুণীজনদের যথাযথ সম্মান জানানো আমাদের কর্তব্য। যারা মুক্তিযুদ্ধ, সাহিত্য, বিজ্ঞান, সংস্কৃতি, সমাজসেবা এবং শিক্ষায় অসামান্য অবদান রেখেছেন, তাদের অবদান চিরস্মরণীয় রাখতে হবে। এই পুরস্কার ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে তাদের পথ অনুসরণে অনুপ্রাণিত করবে।
অনুষ্ঠানে মন্ত্রিপরিষদ সচিব ড. শেখ আব্দুর রশীদ পুরস্কার বিতরণ পর্ব সঞ্চালনা করেন এবং পুরস্কারপ্রাপ্তদের সাইটেশন পাঠ করেন। অনুষ্ঠানটি জাতীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ একটি মুহূর্ত হিসেবে গণ্য করা হয়, যেখানে দেশের শীর্ষ ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন।