বাংলাদেশে ঈদুল ফিতর: নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় দলগুলোর অবস্থান
দিগন্ত জার্নাল ডেস্ক:
বাংলাদেশে এবারের ঈদুল ফিতর পালিত হচ্ছে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায়। বিএনপি, জামায়াতের মতো পুরনো রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাকর্মীরা নিজ নিজ এলাকায় সক্রিয় সময় কাটাচ্ছেন, পিছিয়ে নেই সদ্য গঠিত দল এনসিপিও। তবে এবারের ঈদে মাঠে কোনো ‘সরকারি দল’ নেই। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের পাশাপাশি তৃণমূলের অনেক নেতাকর্মীও আত্মগোপনে রয়েছেন বা এলাকা থেকে দূরে অবস্থান করছেন। গণঅভ্যুত্থানের পর সময় যত গড়িয়েছে, অভ্যুত্থানের পক্ষগুলোর মধ্যে বিভিন্ন ইস্যুতে মতভেদ ততই স্পষ্ট হয়েছে। রমজান মাসজুড়ে ইফতার আয়োজনে বিভিন্ন দলের নেতাদের পরস্পরবিরোধী বক্তব্য দিতে দেখা গেলেও, দীর্ঘ সময় পর একে অপরকে আমন্ত্রণ জানিয়ে অংশগ্রহণের ঘটনা রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
ঈদের পর দেশের রাজনীতিতে নির্বাচন এবং সংস্কার ইস্যুতে দলগুলোর মতভেদ আরও সামনে আসতে পারে। বিএনপি, জামায়াত এবং এনসিপির নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ঈদের সময়টাকে কাজে লাগিয়ে তারা নির্বাচনী প্রচারের মতো প্রচেষ্টা চালিয়েছেন। কোনো কোনো রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে তৃণমূল কর্মীদের এ বিষয়ে তৎপর থাকতে বলা হয়েছে। নির্বাচনের দিন-তারিখ নিয়ে আলোচনা এখন রাজনৈতিক অঙ্গনের অন্যতম প্রধান বিষয়। সম্প্রতি স্বাধীনতা দিবসে জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, “নির্বাচন এ বছর ডিসেম্বর থেকে আগামী বছরের জুনের মধ্যে অনুষ্ঠিত হবে।” তবে তার এই বক্তব্যে বিএনপি হতাশা প্রকাশ করেছে এবং নির্দিষ্ট রোডম্যাপ ঘোষণার দাবি জানিয়েছে।
বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, “আমরা মনে করি, নির্বাচন হলে জনগণের ম্যান্ডেট পাওয়া সরকার আসবে।” বিএনপির নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ জানান, ঈদের পর প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে দেখা করে তারা নির্দিষ্ট তারিখ ঘোষণার আহ্বান জানাবেন। প্রত্যাশিত ঘোষণা না এলে অন্যান্য রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে আন্দোলন কর্মসূচি চূড়ান্ত করা হবে। বিএনপি মনে করছে, নির্বাচনকে ঘিরে অনিশ্চয়তা থাকলে রাজনৈতিক অঙ্গনে চাপ অব্যাহত রাখতে হবে, যাতে সরকার একটি নির্দিষ্ট পরিকল্পনা উপস্থাপন করতে বাধ্য হয়।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেছেন, “সরকার একটি সময়সীমা দিয়েছে, আমরা সেটি মেনে নিতে প্রস্তুত। আমাদের কাছে সময় গুরুত্বপূর্ণ নয়, বরং নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত করাই মূল বিষয়।” তিনি আরও বলেন, “সংস্কার ছাড়া তাড়াহুড়ো করে নির্বাচন করলে বিগত বছরের মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে, যা দেশের জন্য শুভ নয়।” বিএনপি যেখানে দ্রুত নির্বাচনের দাবি করছে, জামায়াত সেখানে সরকারকে নিরপেক্ষ নির্বাচনের আয়োজন নিশ্চিত করার সুযোগ দিতে চায়।
জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) রাষ্ট্রীয় সংস্কারের দাবিতে মাঠে থাকতে চায়। দলটির সদস্য সচিব আখতার হোসেন বলেন, “গণতান্ত্রিক উত্তরণের জন্য রাষ্ট্রীয় সংস্কার প্রক্রিয়া জরুরি। জনগণের কাছে আমরা এই বার্তা পৌঁছে দেবো।” এনসিপি মনে করছে, বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজনের জন্য প্রথমে রাষ্ট্রের সামগ্রিক কাঠামো সংস্কারের প্রয়োজন। তারা বলছে, সরকার যদি সংস্কার নিয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়, তবে নির্বাচন একটি স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠিত হবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক সাব্বির আহমেদ মনে করেন, বিএনপি নির্বাচনের সময় নির্ধারণে চাপ ধরে রাখতে চাইবে, তবে অস্থিতিশীল কর্মসূচিতে যাবে না। অন্যদিকে, জামায়াতের অবস্থান নিরপেক্ষ নির্বাচনের ওপর নির্ভরশীল থাকলেও তারা সরাসরি কোনো আন্দোলনে নামবে না। এনসিপির জন্য সময় গড়ালে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করার সুযোগ তৈরি হবে। ফলে, বর্তমান রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যেও দলগুলো নিজেদের কৌশলগত অবস্থান তৈরি করতে চাইবে।
বিএনপি এবং এনসিপি ভিন্ন ভিন্ন অগ্রাধিকার নিয়ে মাঠে থাকলে রাজনীতিতে উত্তাপ ছড়াতে পারে। তবে এনসিপি মনে করছে, পূর্বের মতো সহিংস রাজনীতির বাইরে এসে নীতিনির্ধারণী আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো উচিত। সরকার যদি সত্যিই সংস্কারমূলক পদক্ষেপ নেয়, তবে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সমঝোতার সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। কিন্তু বিএনপি মনে করছে, সরকার শুধু সময়ক্ষেপণের কৌশল নিচ্ছে এবং তারা আন্দোলনের মাধ্যমে এ বিষয়ে চাপ বজায় রাখবে।
বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান আগামীতে তৃণমূল পর্যায়ে উত্তেজনা সৃষ্টি করতে পারে, বিশেষ করে যদি মনে হয় সরকার এনসিপিকে বাড়তি সুবিধা দিচ্ছে। অন্যদিকে, সরকারের যদি প্রকৃতপক্ষে সংস্কারের পরিকল্পনা থেকে থাকে, তাহলে ডিসেম্বরের মধ্যে নির্বাচন করা কঠিন হয়ে পড়বে। কেননা, ন্যূনতম সংস্কার এবং রাজনৈতিক ঐকমত্য তৈরি করাই হবে বড় চ্যালেঞ্জ।
ঈদের পর রাজনৈতিক অঙ্গনে নির্বাচন ও সংস্কার ইস্যুতে উত্তাপ বাড়তে পারে, যা আগামী দিনের রাজনীতির গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপির কৌশল এবং সরকারের পরিকল্পনার ওপর নির্ভর করবে আগামী দিনের রাজনৈতিক দৃশ্যপট। ফলে, নির্বাচনের সময় নির্ধারণ, সংস্কার প্রক্রিয়া এবং দলগুলোর অবস্থান নিয়ে আসন্ন মাসগুলোতে রাজনৈতিক উত্তাপ আরও বাড়তে পারে।