ডিজিএফআই আয়নাঘরে ১৬ মাস বন্দি ছিলেন সাবেক রাষ্ট্রদূত মারুফ
দিগন্ত জার্নাল ডেস্ক:
শুক্রবার, ১৮ এপ্রিল ২০২৫ || সাবেক রাষ্ট্রদূত এম মারুফ জামান তার জীবনের সবচেয়ে বিভীষিকাময় অধ্যায়ের বিবরণ দিয়েছেন, যেখানে তিনি শেখ হাসিনা সরকারের সময় ডিজিএফআই পরিচালিত গোপন টর্চার সেল ‘আয়নাঘর’-এ ১৬ মাস ধরে বন্দি ছিলেন। বুধবার (১৬ এপ্রিল) রাজধানীর গুলশানের নিজ বাসভবনে যুগান্তরকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি অপহরণের প্রেক্ষাপট, বন্দিজীবনের ভয়াল অভিজ্ঞতা ও দায়ীদের সম্পর্কে বিস্ময়কর তথ্য তুলে ধরেন।
তিনি জানান, ২০১৭ সালের ৪ ডিসেম্বর বিমানবন্দর এলাকায় পৌঁছানোর আগেই তাকে অস্ত্রের মুখে অপহরণ করে চোখ বেঁধে একটি অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়। পরবর্তীতে তিনি বুঝতে পারেন, সেটি ছিল ঢাকা সেনানিবাস সংলগ্ন ডিজিএফআই-এর কার্যালয়ে অবস্থিত কুখ্যাত টর্চার সেল ‘আয়নাঘর’। সেখানে তার প্রতিটি মুহূর্ত কেটেছে মৃত্যু আতঙ্কে, যেখানে তার ওপর চলত শারীরিক নির্যাতন, খাবারের অপ্রতুলতা, মশা, তেলাপোকায় ভরা স্যাঁতসেঁতে ঘরে বন্দিত্ব।
মারুফ জামান বলেন, তাকে ‘গ্রেড-২’ টর্চার সেলে রাখা হয়েছিল। নিয়মিত মারধর, ওয়াটার বেডিং, দাঁত ফেলে দেওয়া, পায়ের লিগামেন্ট ছিঁড়ে যাওয়া, এমনকি সংক্রমণজনিত যন্ত্রণা সহ্য করতে হয়েছে বিনা চিকিৎসায়। তিনি বলেন, “সবচেয়ে ভয়ংকর ছিল, যাদের একবার বের করে নিয়ে যাওয়া হতো, তাদের অনেককেই আর ফিরে আসতে দেখা যেত না।”
তার ভাষ্য অনুযায়ী, আয়নাঘর ছিল মূলত ডিজিএফআই পরিচালিত যৌথ জিজ্ঞাসাবাদ সেল (JIC), যেটিকে এক সময় ব্যবহার করা হতো বড় অপরাধীদের তথ্য আদায়ে। কিন্তু শেখ হাসিনার আমলে সেটিকে ভিন্নমত দমন ও ভয় দেখানোর একটি কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে।
তিনি বলেন, “আমার একমাত্র অপরাধ ছিল ভারতীয় আগ্রাসনের বিরুদ্ধে এবং হাসিনা সরকারের সমালোচনামূলক লেখা প্রকাশ করা। এজন্য ভারতপন্থী গোষ্ঠী এবং ক্ষমতাসীন মহল আমার ওপর ক্ষিপ্ত ছিল।”
জানান, অপহরণের আগে থেকেই ডিজিএফআই সদস্যরা তার বাসার আশপাশে নজরদারিতে ছিল। অপহরণের দিন তার মেয়েরা বিদেশ থেকে ফিরছিল, তিনি বিমানবন্দরে যেতে গিয়ে নিখোঁজ হন। এরপর পরিবার প্রশাসনের বিভিন্ন সংস্থায় যোগাযোগ করেও কোনো সাড়া পায়নি।
প্রায় ১৬ মাস পর ২০১৯ সালের ১৪ এপ্রিল তাকে ধানমন্ডির বাসার সামনে ফেলে রেখে যাওয়া হয়। মুক্তির সময় তাকে শর্ত দেওয়া হয়, আগামী এক বছর তিনি কোনো সাক্ষাৎকার দিতে পারবেন না, না হলে তার দুই মেয়েকে ‘শেষ করে দেওয়া’ হবে। সন্তানদের নিরাপত্তার কথা ভেবে তিনি চুপ ছিলেন হাসিনা সরকারের মেয়াদ পর্যন্ত।
তিনি অভিযোগ করেন, অপহরণের বিষয়ে প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও সাবেক সেনাপ্রধান আবু বেলালসহ কেউ তাকে সাহায্য করেননি। বরং তার নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় সবাই মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল।
মারুফ জামান মনে করেন, আয়নাঘরের মতো গোপন নির্যাতন কেন্দ্রের দায়ীরা এখনো প্রভাবশালী পদে বহাল থাকায় এই ঘটনায় আজও সঠিক বিচার হয়নি।