হানি ট্র্যাপের নামে চলছে মানি ট্র্যাপ : টার্গেটে ধনাঢ্য ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা
দিগন্ত জার্নাল ডেস্ক:
শনিবার, ২৬ এপ্রিল ২০২৫ | সুন্দরী তরুণীদের সামনে রেখে পাতা হানি ট্র্যাপ এখন আর শুধু প্রেমের ছলচাতুরি নয়, এটি রীতিমতো একটি সংগঠিত অপরাধ চক্রে পরিণত হয়েছে—যার শিকার হচ্ছেন সমাজের সম্মানিত, প্রভাবশালী ও ধনাঢ্য ব্যক্তিরা। দিন দিন ভয়ানক রূপ নিচ্ছে এই হানি ট্র্যাপ, যেটি এখন এক প্রকার মানি ট্র্যাপে রূপান্তরিত হয়ে মানুষের আর্থিক ও সামাজিক নিরাপত্তাকে চরমভাবে হুমকির মুখে ফেলছে।
দেশি-বিদেশি প্রেক্ষাপটে চক্রগুলো একদিকে যেমন অনলাইন প্ল্যাটফর্মে সক্রিয়, অন্যদিকে অফলাইনেও তারা নানা রকম কৌশলে টার্গেট তৈরি করছে। যৌন আবেদনের ফাঁদে ফেলে কাউকে ভিডিও কলে জড়ানো, নগ্নতা রেকর্ড করে জিম্মি করা, কিংবা সরাসরি রুম ডেটের নামে বাসায় আটকে রাখা—সবই এখন তাদের পরিচিত কৌশল।
বিশ্বস্ত সূত্র জানায়, একাধিক ভুক্তভোগী নিজেদের অভিজ্ঞতা শেয়ার করে জানিয়েছেন—প্রথমে বন্ধুত্ব, পরে প্রেম, এরপর ভিডিও কলে ‘ইন্টিমেট’ আলাপ। তারপরই শুরু হয় ভয়াবহ ব্ল্যাকমেইল। টাকার অঙ্ক কখনো লাখ ছাড়ায়, কখনো আরও বেশি। এভাবে টাকা আদায় করে নেয়া হচ্ছে বিকাশ, নগদ বা অনলাইন ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে। ভুক্তভোগীদের একটি বড় অংশের দাবি—এই চক্রে দেশের বাইরেও রয়েছে অপারেটর, যারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুধু টার্গেট ব্যক্তিকেই নয়, বরং তার পরিবার-পরিজনদেরও ফ্রেন্ড লিস্টে ঢুকিয়ে রাখে। এরপরই শুরু হয় মানসিক সন্ত্রাস।
বিশেষ করে ২০ থেকে ৫০ বছর বয়সী পুরুষেরা এ ফাঁদে সবচেয়ে বেশি পা দিচ্ছেন বলে জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। কেউ কেউ ‘কলগার্ল’ এর পরিচয়ে ফাঁদে পড়ছেন, আবার কেউ টিকটক, ইনস্টাগ্রাম, ইউটিউব শর্টস ও ফেসবুক পেইজে বিজ্ঞাপন দেখে জড়িয়ে পড়ছেন এই জালে।
সিআইডি’র সাইবার পুলিশ সেন্টারের (সিপিসি) তথ্য অনুযায়ী, শুধুমাত্র তাদের কাছেই প্রতি মাসে গড়ে ৩০টি গুরুতর অভিযোগ জমা পড়ে হানি ট্র্যাপ নিয়ে। তবে এটি বাস্তবে অনেক বড় একটি সংখ্যা, কারণ সামাজিক লজ্জা ও পারিবারিক মর্যাদাহানির ভয়ে অধিকাংশ ভুক্তভোগী মামলা করতে চান না।
ঢাকার দোহারের প্রবাসী সোহেল মৃধা, বরিশালের এক তরুণ, মিরপুরের এক ব্যবসায়ীসহ একাধিক ব্যক্তি হানি ট্র্যাপের চক্রের কৌশলের কাছে আর্থিক ও মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। কেউ নুড ভিডিও কলে অংশগ্রহণ করে ব্ল্যাকমেইলের শিকার হয়েছেন, কেউ আবার এনআইডি ও ছবি দিয়ে “ব্যবসায়িক সম্পর্ক” গড়ে তুলে প্রতারিত হয়েছেন।
অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, এটি নিছক প্রেমঘটিত ব্ল্যাকমেইল নয়—এটি একটি সুপরিকল্পিত সাইবার অপরাধ, যার পেছনে আন্তর্জাতিক চক্র সক্রিয় থাকতে পারে।
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) সাইবার ইউনিট এবং সিআইডি সাইবার পুলিশের কর্মকর্তারা স্পষ্ট করে জানিয়েছেন—আইন প্রয়োগকারীদের একার পক্ষে এই সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়, যদি না জনসাধারণ প্রযুক্তি ব্যবহারে সচেতন হয়।
তারা বলেন, “সাইবার স্পেসে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রযুক্তি বিষয়ে স্বচ্ছ ধারণা থাকা জরুরি। সচেতনতা ছাড়া প্রযুক্তির জগতে যেকোনো সময় বিপদ ডেকে আনতে পারে।”
এই ভয়ঙ্কর ‘মধু ফাঁদ’ থেকে মুক্তির পথ একটাই—সচেতনতা, আত্মসংযম ও প্রযুক্তি ব্যবহারে সুবিবেচনা।