ফারাক্কার ধ্বংসাত্মক প্রভাবে পদ্মা অববাহিকার ১২ জেলার কোটি মানুষ নদী ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত
দিগন্ত জার্নাল ডেস্ক:
সোমবার, ২৮ এপ্রিল ২০২৫ | ১৯৭৫ সালের ২১ এপ্রিল ভারতের গঙ্গা নদীতে ফারাক্কা বাঁধ চালুর পর থেকে গত প্রায় ৫০ বছরে বাংলাদেশের পদ্মা অববাহিকায় নদী ভাঙন ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। পদ্মার দুই তীর ও চরাঞ্চলে বসবাসকারী প্রায় আড়াই কোটি মানুষ ফারাক্কার প্রভাবে সৃষ্ট আকস্মিক বন্যা ও নদী ভাঙনে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। ফারাক্কার ১৮ কিলোমিটার ভাটিতে অবস্থিত চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার পাঁকা ইউনিয়নের বোগলাউড়ি, লক্ষ্মীপুর ও বাবপুরসহ শত শত গ্রাম ভাঙনের শিকার হয়ে কোটি কোটি টন জমি ও সহায় সম্বল পদ্মার গর্ভে বিলীন হয়েছে। ভাঙনে সর্বস্বান্ত হয়ে বহু পরিবার আজ নিঃস্ব দিনমজুর কিংবা ফেরিওয়ালায় পরিণত হয়েছে। নদীভাঙনের শিকার হয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহী, নাটোর, কুষ্টিয়া, পাবনা, ফরিদপুর, শরীয়তপুর, রাজবাড়ী, মাদারীপুর, মানিকগঞ্জ ও মুন্সীগঞ্জ জেলার বহু মানুষ বসতভিটা হারিয়ে অন্যত্র ঠাঁই নিয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা জানান, ফারাক্কার প্রভাবে পদ্মার স্বাভাবিক পলি প্রবাহ বন্ধ হয়ে গেছে। এর বদলে পদ্মায় আসছে শুধু বালু, ফলে নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে মরুভূমির রূপ নিয়েছে। বর্ষাকালে ফারাক্কার সব গেট খুলে দেওয়ায় হঠাৎ বিশাল পানির চাপ এসে তীরবর্তী গ্রামগুলো ভাসিয়ে নিচ্ছে এবং সর্বগ্রাসী নদী ভাঙন ঘটাচ্ছে। গবেষণায় দেখা গেছে, ১৯৭৫ থেকে ১৯৯২ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে সোয়া লাখ কোটি টাকা, বর্তমানে বছরে ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, চাঁপাইনবাবগঞ্জের ২৫টি গ্রাম এখন সরাসরি ফারাক্কার পানির ধাক্কায় পড়ছে। স্থানীয়রা বলছেন, ফারাক্কা বাঁধ চালুর আগে পদ্মার ভাঙন ছিল কম এবং জমি নদীতে গেলেও কিছু বছরের মধ্যে চর জেগে তা আবাদযোগ্য হয়ে উঠত। কিন্তু এখন জমি হারানোর পর নতুন চরও জেগে উঠছে না, ফলে লাখ লাখ মানুষ জমিজমা ও বাড়িঘর হারিয়ে চরম দুর্দশায় দিন কাটাচ্ছেন।
বিশিষ্ট নদী গবেষক মাহবুব সিদ্দিকী জানিয়েছেন, ফারাক্কার কারণে এখন পদ্মায় পলিমাটি না আসায় চরাঞ্চলের ভূমি কৃষিকাজের অযোগ্য হয়ে পড়েছে এবং খাদ্য সংকট দেখা দিয়েছে। ফলে নদীভাঙনের শিকার পরিবারগুলোর অনেকে জীবিকার সন্ধানে অজানা শহরে পাড়ি জমাচ্ছেন। নদী ভাঙন ঠেকাতে কোটি কোটি টাকা ব্যয় করেও কার্যকর ফল পাওয়া যাচ্ছে না। ভাঙন ঠেকাতে এবং নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনতে দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই উদ্যোগ গ্রহণের দাবি জানাচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা ও ভুক্তভোগী মানুষ।