ইসলাম ও নারী উন্নয়ন : একটি বাস্তবভিত্তিক পর্যবেক্ষণ: মুফতী হাফীজুদ্দীন - দিগন্ত জার্নাল

ইসলাম ও নারী উন্নয়ন : একটি বাস্তবভিত্তিক পর্যবেক্ষণ: মুফতী হাফীজুদ্দীন

মুফতী হাফীজুদ্দীন, ভাইস প্রিন্সিপাল, জামিয়া শারইয়্যাহ, মালিবাগ, ঢাকা।

দিগন্ত জার্নাল ডেস্ক:

শনিবার, (৩ মে ২০২৫) বাংলাদেশে নারী উন্নয়ন নিয়ে সাম্প্রতিক আলোচনাগুলো এক নতুন মোড় নিয়েছে। শিক্ষা, অধিকার, কর্মসংস্থান ও সামাজিক অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে নারীর অগ্রগতি নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়, তবে এই অগ্রগতির পেছনে যে চিন্তাধারাগত দ্বন্দ্ব ও বিতর্ক বিদ্যমান, তা উপেক্ষাযোগ্য নয়। বিশেষ করে বারবার একটি প্রশ্ন সামনে আসছে—”ইসলাম কি নারী উন্নয়নের পথে অন্তরায়?”

দুঃখজনক হলেও সত্য, এই অভিযোগ আজকাল কিছু আত্মবিস্মৃত, আত্মঘৃণায় নিমজ্জিত তথাকথিত আধুনিক নারীবাদী ও প্রগতিশীল গোষ্ঠীর মুখে নিয়মিত উচ্চারিত হচ্ছে। তারা ইসলামকে নারীর অবরুদ্ধ জীবনের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরতে চায়; অথচ ইতিহাস ও বাস্তবতা প্রমাণ করে—ইসলামই নারীর মর্যাদা ও সম্মানের সর্বপ্রথম পূর্ণাঙ্গ ভিত্তি স্থাপন করেছে। এই বিভ্রান্তিকর প্রবণতা কেবল সত্যবিচ্যুত নয়, বরং আমাদের সমাজের স্বকীয় মূল্যবোধ, বিশ্বাস ও ঐতিহ্যের প্রতিও এক নির্মম অবিচার।

“ইসলাম কি নারী উন্নয়নের পথে প্রতিবন্ধক?”—এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার পূর্বে প্রয়োজন ইতিহাস, সমাজ ও ধর্মীয় দর্শনের নিরপেক্ষ বিশ্লেষণ। আবেগ নয়, সত্য জানতে চাই বাস্তবতা ও বুদ্ধিবৃত্তিক সততা।

ইতিহাসের পাতা থেকে: ইসলামে নারীর মর্যাদা এক বিপ্লব

ইসলাম আবির্ভূত হয়েছিল এমন এক সময়, যখন নারীর সামাজিক অবস্থান ছিল শূন্যের কোঠায়। কন্যাশিশু জন্ম ছিল অভিশাপস্বরূপ, অনেক পিতা তাদের জীবন্ত কবর দিত। এমন বর্বর সমাজেই নবী মুহাম্মদ (সা.) ঘোষণা করেন—”যে ব্যক্তি কন্যাসন্তান লালন-পালন করে, তাদের প্রতি সদ্ব্যবহার করে, তাকে জান্নাত দেওয়া হবে।” (আল হাদীস)

এই একটি বাণীই নারীর মর্যাদায় এক বৈপ্লবিক যুগান্তরের সূচনা করে। কোরআন ঘোষণা করে—”আমি তোমাদেরকে এক পুরুষ ও এক নারী থেকে সৃষ্টি করেছি।” (সূরা হুজুরাত: ১৩)। নারী-পুরুষের এই সমান মর্যাদার কথা ইসলাম ছাড়া আর কোনো ধর্ম এত সুস্পষ্টভাবে বলেনি।

ইসলামে নারীর অধিকার: একটি পূর্ণাঙ্গ কাঠামো

১. শিক্ষার অধিকার:
হাদীসে এসেছে, “জ্ঞান অর্জন করা প্রত্যেক মুসলমান নর-নারীর উপর ফরজ।” এমন ঘোষণার যুগে নারী শিক্ষা ছিল অকল্পনীয়। ইসলাম নারীদের জন্য সেই দ্বার উন্মুক্ত করেছে।

২. অর্থনৈতিক স্বাধীনতা ও মালিকানা:
উম্মুল মোমিনীন খাদিজা (রা.) ইসলামপূর্ব যুগেই একজন স্বনির্ভর ব্যবসায়ী ছিলেন। ইসলাম সেই অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতার স্বীকৃতি দিয়েছে। নারীর উপার্জন, সম্পদ—সবকিছুর একচ্ছত্র মালিকানা তার নিজস্ব অধিকার।

৩. উত্তরাধিকার:
যখন পাশ্চাত্যে নারী ছিল সম্পত্তির অংশমাত্র, ইসলাম ৭ম শতাব্দীতেই নারীর উত্তরাধিকার নিশ্চিত করেছে। ইউরোপে যা এসেছে বহু শতাব্দী পর।

৪. রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক অংশগ্রহণ:
হযরত আয়েশা (রা.) ছিলেন ইসলামী জ্ঞানের এক মহারথী। তিনি ফিকহ ও হাদীসশাস্ত্রে অগ্রগণ্য, বহু সাহাবী তাঁর থেকে জ্ঞান গ্রহণ করেছেন।

৫. বিয়ে ও পারিবারিক অধিকার:
নারীকে বিয়েতে মতামতের স্বাধীনতা দিয়েছে ইসলাম। স্বামী যেমন স্ত্রীর প্রতি দায়িত্বশীল, তেমনি স্ত্রীর মর্যাদাও নিশ্চিত করেছে ইসলাম। নবী (সা.) বলেন—“তোমরা নারীদের সাথে উত্তম আচরণ করো।”

আধুনিক নারীবাদ বনাম ইসলামী নারীতত্ত্ব

আধুনিক নারীবাদ যেমন কিছু অধিকার অর্জনে ভূমিকা রেখেছে, তেমনি অনেক বিভ্রান্তিও ছড়িয়েছে। প্রশ্ন হলো—নারীর উন্নয়ন বলতে কি কেবল চাকরি, আয় বা অফিসে কাজকেই বোঝানো হয়? নাকি উন্নয়ন বলতে বোঝায় তার আত্মমর্যাদা, পারিবারিক স্থিতি, মাতৃত্বের স্বীকৃতি এবং নিরাপদ সমাজে বেঁচে থাকার অধিকার?

আজকের ভোগবাদী সমাজ নারীর ‘স্বাধীনতা’র নামে তাকে পণ্যে রূপান্তরিত করেছে। বিজ্ঞাপন থেকে শুরু করে মিডিয়া—সবখানে নারী একটি বিপণন উপকরণ। অথচ ইসলাম নারীর শালীনতা, নিরাপত্তা ও মর্যাদাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছে। পর্দা নারীকে আবদ্ধ করে না, বরং অন্যায়ের হাত থেকে রক্ষা করে।

বাস্তবতা ও ভবিষ্যতের দিকনির্দেশনা

নারী উন্নয়নের নামে যেসব আদর্শ চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে, তা অনেক সময় নারীর পারিবারিক ভারসাম্যকে ধ্বংস করছে, আত্মিক শান্তি কেড়ে নিচ্ছে এবং মাতৃত্বকে অপমান করছে। নারী যেন এক কর্পোরেট যন্ত্রে রূপ নিচ্ছে, যেখানে নৈতিকতা নয়, কেবল কর্মদক্ষতা ও বাহ্যিক সফলতা মূল্যায়িত হচ্ছে।

তাই প্রশ্ন করতেই হয়—

কোন ধর্ম নারীর সম্মানে বলে—“জান্নাত রয়েছে মায়ের পায়ের নিচে”?

কোন ধর্ম বলে—“তোমার উপার্জন তোমার, কিন্তু স্বামীর উপর রইল সম্পূর্ণ ভরণপোষণের দায়িত্ব”?

বাংলাদেশেই আজ অসংখ্য মুসলিম নারী চিকিৎসক, শিক্ষক, প্রশাসক, উদ্যোক্তা ও গবেষক হিসেবে দৃষ্টান্ত স্থাপন করছেন। তারা প্রমাণ করছেন—ইসলাম নারীকে আটকে রাখে না, বরং তার সম্ভাবনাকে বিকশিত করে।

উপসংহার

নারীবান্ধব সমাজ গঠনে ইসলামই দেয় সবচেয়ে ভারসাম্যপূর্ণ, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই দিকনির্দেশনা। পরিবার, শিক্ষা ও সমাজ—এই তিন স্তম্ভে সমন্বয় করে নারী উন্নয়নের বাস্তবমুখী পথ Islam নির্দেশ করে। আজ সময় এসেছে মুসলিম নারীদের আত্মবিশ্বাসের সাথে ইসলামী নারীতত্ত্বের সৌন্দর্য বিশ্বে তুলে ধরার। ইসলাম নারী উন্নয়নের অন্তরায় নয়—বরং তা নারী মর্যাদার প্রকৃত ভিত্তি।

an adbox will go here