অবৈধ বাংলাদেশি সন্দেহে ধরপাকড়, সীমান্তে পুশ-ব্যাক ও মানবাধিকার বিতর্ক
প্রাতিবেদক: ফারজানা রুবি
শনিবার , (১৭ মে ২০২৫) ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে ‘অবৈধ বাংলাদেশি’ হিসেবে চিহ্নিত ব্যক্তিদের আটক ও সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার ঘটনা সম্প্রতি নতুন মাত্রা পেয়েছে। ভারতের গুজরাত, রাজস্থানসহ বিভিন্ন রাজ্যে একযোগে চালানো অভিযানে হাজারেরও বেশি মানুষের পরিচয় ‘বাংলাদেশি’ বলে সন্দেহ করে তাদের ধরে সরাসরি সীমান্তে পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে। ভারতের দৃষ্টিতে এটি ‘পুশ-ব্যাক’, অথচ বাংলাদেশের দৃষ্টিতে একে বলা হয় ‘পুশ-ইন’—কেননা এতে কার্যত বাংলাদেশে বিদেশি অনুপ্রবেশ ঘটছে।
বিবিসি বাংলার অনুসন্ধান বলছে, পুশ-ব্যাক কোনো আইনসম্মত প্রক্রিয়া নয়, বরং এটি বহুদিন ধরে চলে আসা একটি অনানুষ্ঠানিক পদ্ধতি। ভারতের সংবিধান অনুযায়ী, একজন বিদেশিকেও আদালতে তোলা, বিচারপ্রক্রিয়া শেষ করা এবং তারপর কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ফেরত পাঠানোর নিয়ম রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে এসব মানা হচ্ছে না বলে অভিযোগ করেছেন মানবাধিকার কর্মীরা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বেআইনি অনুপ্রবেশ যদি হয়ও, তবে সেটি মোকাবেলায় আইনের যে পথ রয়েছে, তা পরিহার করে পুশ-ব্যাকের মতো পদ্ধতি চালানো মানবাধিকার পরিপন্থী। ভারতের মানবাধিকার সংগঠন ‘মাসুম’-এর প্রধান কিরীটী রায় বলেছেন, “ভারতের মাটিতে থাকাকালীন একজন বিদেশিও সংবিধানসম্মত অধিকার পাবেন—এটা আদালতের নির্দেশিত নীতি। অথচ এখন যেটা হচ্ছে, তা আইন, বিচার এবং মানবতা—তিনটিকেই অগ্রাহ্য করছে।”
গুজরাত ও রাজস্থান পুলিশ দাবি করছে, চিহ্নিত ব্যক্তিদের মধ্যে যাদের বাংলাদেশি পরিচয় প্রমাণিত হয়েছে, তাদেরই ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু অনেকে বলছেন, এই প্রক্রিয়ায় আদালতের কোনো ভূমিকাই নেই। এমনকি রাজস্থানে ধরা পড়া ১৪৮ জনের প্রথম দলটিকে এক বিশেষ ফ্লাইটে ত্রিপুরায় এনে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিজয়নগর সীমান্ত দিয়ে পাঠানোর চেষ্টা করা হয়েছে—যা নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্পর্কেও জটিলতা তৈরি হতে পারে।
গুজরাট পুলিশের একটি সূত্র জানিয়েছে, সময় ও ব্যয় বাঁচাতে এখন আর আদালতের মাধ্যমে নয়, সরাসরি জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেলে পাঠিয়ে বাংলাদেশি চিহ্নিত হলেই সীমান্তে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। এই সূত্রটি বলছে, “আইনি প্রক্রিয়া মানলে জেলখানাগুলোতে জায়গা থাকবে না, আর পেছনে কয়েক বছর সময় লেগে যাবে। তাই এখন যে প্রক্রিয়া চলছে, সেটিই বাস্তবসম্মত।”
এদিকে পশ্চিমবঙ্গ থেকে গুজরাত বা রাজস্থানে গিয়ে কাজ করা বহু শ্রমিকও একইভাবে আটক হচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। পরিযায়ী শ্রমিক ঐক্য মঞ্চের তথ্য অনুযায়ী, তাদের হেল্পলাইনে আসা ৭০০টির বেশি ফোনকলের মধ্যে মাত্র একজন ব্যক্তিকে আদালতে তোলা হয়েছিল। সংগঠনটির নেতা আসিফ ফারুক বলেন, “বাকি সবাইকেই সরাসরি আটক রেখে সীমান্তে পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এটা চরম মানবাধিকার লঙ্ঘন।”
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, বিএসএফ বা ভারতীয় কর্তৃপক্ষ প্রকাশ্যে কখনও পুশ-ব্যাকের বিষয়টি স্বীকার করে না। বরং তারা বরাবরই বলে এসেছে, তাদের ডিকশনারিতে ‘পুশ-ব্যাক’ শব্দটি নেই। অথচ বাস্তবতার ভিন্ন চিত্র বলছে কিছু আর্থ-রাজনৈতিক ও অভ্যন্তরীণ চাপের কারণেই ভারত এক ধরনের ‘নীরব অভ্যর্থনায়’ এ প্রক্রিয়াকে চালিয়ে যাচ্ছে।
সবশেষে প্রশ্ন থেকে যায়—পুশ-ব্যাকের মাধ্যমে কারা আসলেই বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে? তাদের পরিচয় কতটা যাচাই করে এই কাজ হচ্ছে? কোনো নিরপরাধ ব্যক্তি কি এতে হয়রানির শিকার হচ্ছেন না? এসব প্রশ্নের উত্তর এখনও অধরা। আর তার মাঝেই সীমান্ত পেরিয়ে একের পর এক মানবিক গল্প জমা হচ্ছে প্রাচীরের দুই প্রান্তে।