৮ মাসে ২৮০ কাজ পেয়েছে ইউনুস ব্রাদার্স, গুঞ্জনে তোলপাড়
দিগন্ত জার্নাল ডেস্ক:
সোমবার, (১৯ মে ২০২৫) ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন পিরোজপুরের সাবেক সংসদ সদস্য মহিউদ্দিন মহারাজ। তার এই সিন্ডিকেটের অন্যতম অংশীদার চট্টগ্রামের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মোহাম্মদ ইউনুস অ্যান্ড ব্রাদার্স। সরকার পরিবর্তনের পর মহারাজ দেশ ছেড়ে দুবাইয়ে পাড়ি জমালেও ইউনুস ব্রাদার্সের দাপট এখনো অটুট। বিশেষ করে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) কাজে অনিয়মের অভিযোগে ১৬০০ কোটি টাকার আত্মসাতের ঘটনায় প্রতিষ্ঠানটির নাম উঠে আসে। তবুও দুর্নীতির দায়ে কালো তালিকাভুক্ত না হয়ে তারা গত আট মাসেই এলজিইডি, সওজ, পাউবোসহ বিভিন্ন সরকারি দপ্তর থেকে ২৮০টি কাজ পেয়ে যায়, যার মোট দর ৮৩৬ কোটি টাকা। এ নিয়ে বিভিন্ন মহলে নানা গুঞ্জন শুরু হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট অনেকেই বলছেন, আওয়ামী আমলের বিতর্কিত ঠিকাদার জি কে শামীমের চেয়েও কৌশলী ইউনুস ব্রাদার্স। শামীম গ্রেফতার হলেও ইউনুস ব্রাদার্স দুই আমলেই (আওয়ামী লীগ ও অন্তর্বর্তীকালীন সরকার) থেকেছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। অভিযোগ রয়েছে, তারা নিজেরা কম কাজ করে, বরং অন্য ঠিকাদারদের কাছে বিক্রি করে দেয়। দেশের প্রায় প্রতিটি জেলায় তাদের হয়ে দরপত্রে অংশ নেওয়ার মতো ঠিকাদার প্রস্তুত থাকে। অভিযোগ রয়েছে, এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পলাতক মহারাজই পেছন থেকে বড় খেলা চালিয়ে যাচ্ছেন।
প্রতিষ্ঠানটির উপব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ ইমরান হোসেন বলেন, ‘আমরা ৫০ বছরের পুরোনো কোম্পানি। আইন মেনেই কাজ করি। কেউ কেউ আমাদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে।’ তিনি দাবি করেন, তারা কাজ বিক্রি করে না, বরং অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে কেউ কেউ কাজ করেন। তবে আট মাসে ৮৩৬ কোটি টাকার কাজ পাওয়া অস্বাভাবিক নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
প্রাপ্ত নথি অনুযায়ী, গত ৫ আগস্ট থেকে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত ইউনুস অ্যান্ড ব্রাদার্স এলজিইডি, সওজ, পাউবো, বিএডিসি, গণপূর্ত, শিক্ষা প্রকৌশল, খাদ্য অধিদপ্তরসহ মোট ৮টি দপ্তর থেকে ২৮০টি কাজ পেয়েছে। যার মধ্যে এলজিইডির ১৭৩টি কাজের দর ৬০৩ কোটি টাকা। সওজের ৮১টি কাজ ৩৭ কোটি টাকার এবং পাউবোর ১৫টি কাজের দর ১৭৩ কোটি টাকা। অন্যান্য বিভাগ থেকেও তারা উল্লেখযোগ্য সংখ্যক প্রকল্প পেয়েছে।
নথিতে দেখা যায়, শুধুমাত্র ২৯ এপ্রিলেই সওজ ও পাউবোর ১১টি কাজ পেয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। এর আগে ৮ থেকে ৩০ এপ্রিলের মধ্যে গোপালগঞ্জ, দিনাজপুর, সিরাজগঞ্জ, রাজশাহী, কিশোরগঞ্জ, হবিগঞ্জ, বরিশাল, জামালপুরসহ বিভিন্ন জেলায় তারা একাধিক কাজ পায়। এভাবে আট মাসে দেশের প্রায় প্রতিটি জেলায় তাদের প্রকল্প ছড়িয়ে আছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একটি প্রতিষ্ঠানের পক্ষে এত কাজ সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করা কঠিন। অনেক ক্ষেত্রেই তারা সাব-ঠিকাদারদের মাধ্যমে কাজ করায় মান বজায় থাকে না। প্রকৌশলীদের ‘ম্যানেজ’ করে বিল তোলা ও কাজের গুণগত মান প্রশ্নবিদ্ধ বলে অভিযোগ রয়েছে।
একই সঙ্গে জানা যায়, এলজিইডির পিরোজপুর নির্বাহী প্রকৌশলীর কার্যালয় থেকে ২০২০ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে ইউনুস ব্রাদার্স প্রায় ৯৭ কোটি টাকার কাজ পায়, যার মধ্যে প্রায় ৩৮ কোটি টাকার অগ্রিম বিল তোলা হয় কাজ না করেই। পিরোজপুরে তাদের ৩০টি প্রকল্প এখনও ঝুলে আছে।
এ বিষয়ে এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী মো. আব্দুর রশীদ মিয়া বলেন, ‘ইজিপি টেন্ডারে অনিয়মের সুযোগ নেই। তবে নির্দিষ্ট কোনো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ এলে তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেওয়া হয়।’ তিনি জানান, পিরোজপুরে ১৬০০ কোটি টাকার প্রকল্পে অনিয়মের ঘটনায় মন্ত্রণালয় তদন্ত করেছে এবং দুদক মামলা করেছে। ইউনুস ব্রাদার্সের বিরুদ্ধেও যদি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আসে, আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।