বৈঠক ফলপ্রসূ হওয়ার নেপথ্যে ইউনূস-তারেকের দেশপ্রেম
নিজস্ব প্রতিবেদক:
সোমবার, (১৬ জুন ২০২৫) লন্ডনের ডরচেস্টার হোটেলে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস এবং বি’এন’পি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বহুল প্রতীক্ষিত বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়েছে। বৈঠকটি ঘিরে উত্তেজনার পারদ চূড়ায় উঠেছিল। কারণ, দীর্ঘদিন ধরে সরকারের সঙ্গে বি’এন’পি’র দূরত্ব বাড়তে বাড়তে চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছিল। ‘ডি’সে’ম্বরে নির্বাচন চাই’- এমন দাবিতে বি’এন’পি যখন মাঠে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছিল, তখন সরকার নির্বাচনের সম্ভাবনাকে কার্যত নাকচ করেছিল।
এই পরিপ্রেক্ষিতে ১৩ জুনের বৈঠকটি ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিভিন্ন ষড়’য’ন্ত্র থাকা সত্ত্বেও বৈঠকটি ভেস্তে যায়নি বরং একটি যৌক্তিক সমঝোতায় পৌঁছাতে পেরেছে। ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে সময়সীমা নিয়ে দুপক্ষের মধ্যে যে সমঝোতা হয়েছে, তা দেশের রাজনীতিতে স্বস্তির বার্তা এনেছে।
উইন-উইন সিচুয়েশন, কেউ হারেনি ডরচেস্টারে
এই সমঝোতা ছিল রাজনীতির সৌন্দর্যের একটি অনন্য উদাহরণ। দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ও প্রজ্ঞার পরিচয় দিয়ে তারেক রহমান যেমন পরিণত নেতার ভূমিকা রেখেছেন, তেমনি ড. ইউনূসের পক্ষ থেকেও উদারতার পরিচয় পাওয়া গেছে। নির্বাচনের সময়সীমা নিয়ে সরকার জানায়, প্রয়োজনীয় সংস্কার সম্পন্ন হলে র’ম’জানের এক সপ্তাহ আগে নির্বাচন নিয়ে আপত্তি নেই। অন্যদিকে, বি’এন’পি’র পক্ষ থেকেও ‘ডি’সে’ম্বরেই নির্বাচন চাই’— এই অবস্থান থেকে কিছুটা নমনীয়তা দেখানো হয়েছে।
এই আলোচনায় কেউ হারেনি—ড. ইউনূস তার সংস্কার পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য বি’এন’পি’র সহযোগিতা পেলেন, অন্যদিকে বি’এন’পি তাদের নির্বাচনের টাইমফ্রেম আদায়ে সফল হলো।
দুটি দাবি উঠেছিল, গুরুত্ব পেল একটি
বৈঠকের আগে বি’এন’পি’র তিনটি বড় দাবি ছিল— (১) নির্বাচনের সময়সীমা নির্ধারণ, (২) ঢাকা দক্ষিণে ইশরাক হোসেনকে মেয়র পদে বসানো এবং (৩) তিন উপদেষ্টার পদত্যাগ। তবে বৈঠকে মূল গুরুত্ব পেয়েছে নির্বাচন কেন্দ্রিক আলোচনা। বাকি দুটি বিষয়ে আলোচনা হয়েছে কিনা তা স্পষ্ট নয়। ধারণা করা যায়, বৃহৎ স্বার্থে তারেক রহমান অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বপূর্ণ দাবিগুলো নিয়ে চাপ সৃষ্টি করেননি।
অভিজ্ঞতাই নিয়ে এলো ঐকমত্য
ড. ইউনূস ও তারেক রহমানের জীবনের অভিজ্ঞতা, বিশেষত রাজনৈতিক নিপীড়নের ইতিহাস—এই সমঝোতায় পৌঁছানোর অন্যতম কারণ। অতীতে ড. ইউনূসকে নানা মিথ্যা মামলায় হয়রানি, পদ্মা সেতু প্রকল্পে অন্যায়ভাবে দায়ী করা এবং আদালতে সিঁড়ি দিয়ে উঠতে বাধ্য করার মতো ঘটনা তার জীবনের অংশ হয়ে রয়েছে। অন্যদিকে তারেক রহমানও কারাবরণ, নির্যাতন, দেশত্যাগে বাধ্য হওয়া এবং শতাধিক মামলায় হয়রানির শিকার হয়েছেন। এমন প্রেক্ষাপটে উভয়ের জন্যই সমঝোতা ছিল সময়ের দাবি।
খালেদা জিয়া—‘রাজনৈতিক সেতু’
এই বৈঠকের পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান রয়েছে বি’এন’পি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার। রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও দৃঢ় অবস্থানের কারণে তিনিই ছিলেন এই ঐকমত্য সৃষ্টির মূল কারিগর। তার সিদ্ধান্তেই ড. ইউনূস ও তারেক রহমান এক টেবিলে বসেন। গত আঠারো বছর ধরে যিনি রাজনীতি থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন, তিনিই আবারও প্রমাণ করলেন—তিনি একজন প্রকৃত ‘রাজনৈতিক সেতু’, যিনি দলে এবং দেশের বৃহত্তর স্বার্থে ভূমিকা রাখেন। মিথ্যা মামলায় জর্জরিত, বৃদ্ধ বয়সে জেল-আদালতের শিকার হয়েও তিনি দেশপ্রেম থেকে বিচ্যুত হননি।
অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতের দিকে
বাংলাদেশে ১৯৭৫ পরবর্তী রাজনৈতিক ইতিহাসে কখনোই একটি স্থায়ী রাজনৈতিক সমঝোতা প্রতিষ্ঠিত হয়নি। শেখ মুজিবের সময়ের ‘মুক্তিযুদ্ধপন্থি’ ও ‘বিরোধী’ বিভাজন, জিয়াউর রহমানের বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা, খালেদা জিয়ার আপসহীন নেতৃত্ব—সবমিলিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে ঐকমত্য সবসময়ই অনুপস্থিত ছিল। কিন্তু ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানের পর ২০২৫ সালে এসে এই প্রথম বৃহত্তর ঐক্যের একটি ভিত্তি গড়ে উঠেছে।
তারেক রহমান—এক অনিবার্য নাম
এই বৈঠক প্রমাণ করেছে—তারেক রহমানকে বাদ দিয়ে বাংলাদেশের সমসাময়িক ও আগামীর রাজনৈতিক ইতিহাস লেখা যাবে না। ১৭ বছরের সংগ্রাম, শান্তিপূর্ণ রাজনীতি, আন্দোলনের কৌশলী নেতৃত্ব ও প্রজ্ঞাপূর্ণ অবস্থান তাকে আজকে এই অবস্থানে এনেছে। নির্বাচনের পর বিএনপি যদি সরকারে আসে, তবে খালেদা জিয়া ও ড. ইউনূসের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে ইনক্লুসিভ সরকার গঠন ও জাতীয় ঐকমত্য প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখতে পারেন তারেক রহমান।