নির্বাচন নিয়ে ফের সন্দেহ-অনিশ্চয়তার প্রশ্ন কেন উঠছে? - দিগন্ত জার্নাল

নির্বাচন নিয়ে ফের সন্দেহ-অনিশ্চয়তার প্রশ্ন কেন উঠছে?

নিজস্ব প্রতিবেদক:

বৃহস্পতিবার, (৩ জুলাই ২০২৫) আগামি ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচন আদৌ হবে কি না—এ নিয়ে দেশের রাজনীতিতে ফের জোরালো সন্দেহ ও অনিশ্চয়তার বাতাস বইছে। বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের বক্তব্য ও কর্মকরণে এ সংশয়ের বিষয়টি আরও স্পষ্ট হচ্ছে।

বিএনপি ও প্রধান উপদেষ্টার যৌথ ঘোষণা: ১২ জুন লন্ডনে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে একটি শর্তসাপেক্ষ যৌথ ঘোষণায় বলা হয়, “সংস্কার ও গণঅভ্যুত্থানে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের বিচারে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হলে রমজানের আগে, অর্থাৎ ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন হতে পারে।”

এরপর বিএনপি নেতারা প্রকাশ্যে বলেছিলেন, “নির্বাচন নিয়ে অনিশ্চয়তা কেটে গেছে।” মাঠ পর্যায়ে দলীয় কার্যক্রমে গতি আনে বিএনপি। একইভাবে আওয়ামী লীগবিরোধী ছাত্র-জনতার গঠিত দল এনসিপিও দেশজুড়ে পদযাত্রা ও গণসংযোগে সক্রিয় হয়।

তবু সংশয় কাটছে না: লন্ডন ঘোষণার পর তিন সপ্তাহ কেটে গেলেও নির্বাচন কমিশনকে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো নির্দেশনা দেয়নি সরকার। নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন জানিয়েছেন, প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে সাক্ষাৎ হলেও নির্বাচনের সময়সূচি নিয়ে কোনো আলোচনা হয়নি।

এদিকে প্রধান উপদেষ্টা বা সরকারের পক্ষ থেকেও নির্বাচনের নির্ধারিত সময়সূচি প্রকাশ করা হয়নি, যার ফলে নতুন করে সংশয় তৈরি হয়েছে। বিএনপির তৃণমূল থেকে কেন্দ্রীয় নেতারা পর্যন্ত এ নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন—সরকার কি সত্যিই ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন চায়?

সরকারে দোলাচল? গণতন্ত্র মঞ্চের নেতা সাইফুল হক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সরকারের মধ্যে দোটানা রয়েছে, আর সে কারণেই নির্বাচন নিয়ে ধোঁয়াশা বাড়ছে। অনেকে বলছেন, মাঠ প্রশাসন এখনো প্রস্তুত নয়; তাছাড়া রাজনৈতিক দলগুলোকে ঐক্যবদ্ধ করতেও সরকার ব্যর্থ হয়েছে।

ভোটের পদ্ধতি নিয়ে দ্বিধা: এ অনিশ্চয়তার আরও একটি বড় কারণ হলো ভোটের পদ্ধতি নিয়ে বিভক্ত মতামত। বিএনপি ও তাদের ঘনিষ্ঠ মিত্ররা বিদ্যমান সরাসরি আসনভিত্তিক ভোট চায়। অন্যদিকে, জামায়াত, ইসলামী আন্দোলন, খেলাফত মজলিসসহ ইসলামি ও কিছু বাম দল আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব বা পিআর পদ্ধতির দাবি করছে। এ পদ্ধতিতে ব্যালটে প্রার্থী না রেখে দলীয় প্রতীকে ভোট হয়, আর ভোটের হারে সংসদে আসন বণ্টন হয়।

এ দাবির যৌক্তিকতা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান বলেন,

“এ পদ্ধতিতে স্বৈরাচার হওয়ার সুযোগ থাকে না। ১ শতাংশ ভোট পেলেও সংসদে প্রতিনিধি থাকার সুযোগ তৈরি হয়।”

তবে বিএনপি বলছে,

“বাংলাদেশে এই পদ্ধতি এখন বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। প্রস্তুতির জন্য এক দশক সময় দরকার।”

ঐকমত্য কমিশনের প্রস্তাব: জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ জানান, তারা সংসদের উচ্চকক্ষে পিআর পদ্ধতি এবং নিম্নকক্ষে সরাসরি ভোটের সুপারিশ করেছে। কিন্তু জামায়াতসহ ইসলামি দলগুলো উচ্চ ও নিম্ন দুই কক্ষেই পিআর পদ্ধতি চায়। এদিকে এনসিপি বলেছে, সংসদের উচ্চকক্ষে পিআর পদ্ধতি চলতে পারে, তবে নিম্নকক্ষে তারা সরাসরি ভোট চায়।

রাজনৈতিক বিভাজন ও অনাস্থা: এই বিভক্তি আরও স্পষ্ট হয় যখন ইসলামী আন্দোলন ঢাকা সমাবেশে বিএনপিকে আমন্ত্রণ জানায়নি, বরং জামায়াত, খেলাফত মজলিস, গণঅধিকার পরিষদকে ডেকেছে। ইসলামী আন্দোলন বলেছে,

“বিএনপি যেহেতু পিআর পদ্ধতির পক্ষে নয়, তাই আমন্ত্রণ জানানো হয়নি।”

বিশ্লেষকরা বলছেন, দলগুলোর এ বিভক্তি নির্বাচন নিয়ে অনিশ্চয়তা আরও বাড়াচ্ছে। সাধারণ ভোটাররাও এখন বলছেন, “আসলে ভোট হবে তো?”

সরকারের অভ্যন্তরেও অস্পষ্টতা: সরকারের উপদেষ্টারা বলছেন, নির্বাচন প্রলম্বিত করার কোনো পরিকল্পনা নেই। তবে এখনো ভোট পদ্ধতি, সময়সূচি ও রাজনৈতিক ঐকমত্যের বিষয়ে তারা কোনো সুস্পষ্ট অবস্থান দেয়নি। এতেই সংশয়ের জায়গাটা তৈরি হচ্ছে।

জাতীয় নির্বাচন নিয়ে আলোচনা এখন আর সময়সূচিকে ঘিরে নয়, বরং গভীর রাজনৈতিক ঐক্য, বিশ্বাস, পদ্ধতি ও প্রস্তুতির অভাবকে কেন্দ্র করেই চলছে। রাজনৈতিক দলগুলোর পারস্পরিক মতবিরোধ, সরকারের দোলাচলপূর্ণ অবস্থান এবং জনমানুষের মধ্যে ভর করে থাকা অনাস্থা—সব মিলে ফেব্রুয়ারির সম্ভাব্য ভোট নিয়েই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন, “আসলে ভোট হবে তো?”

an adbox will go here