হাসিনার নীরব সম্মতিতে মাদক-সন্ত্রাসের বিস্তার
দিগন্ত জার্নাল ডেস্ক:
কারবারিদের কাছ থেকে নির্বাচনি অর্থ সংগ্রহ, লোকদেখানো অভিযানে শতাধিক হত্যা, রয়ে গেছে গডফাদাররা
বাংলাদেশে মাদক ও সন্ত্রাসের বিস্তার নিয়ে সম্প্রতি ভয়ংকর তথ্য উঠে এসেছে। অভিযোগ রয়েছে, প্রতিবেশী দেশের গোয়েন্দা সংস্থার সহযোগিতায় পরিকল্পিতভাবে দেশে ইয়াবার বিস্তার ঘটানো হয়েছে। মূল লক্ষ্য ছিল যুবসমাজকে ধ্বংস করা ও অর্থনীতিকে দুর্বল করা। এই চক্রের অন্যতম সহযোগী হিসেবে পরিচিত কক্সবাজার-৪ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য আবদুর রহমান বদির নাম উঠে এসেছে।
গোয়েন্দা তথ্য, দীর্ঘ অনুসন্ধান ও স্থানীয় সূত্র অনুযায়ী, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল ও সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) শহিদুল হক পরিকল্পিতভাবে মাদক-সন্ত্রাসের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। অভিযোগ রয়েছে, তারা ইয়াবা ব্যবসা থেকে নিয়মিত মোটা অঙ্কের কমিশনও নিতেন। একাধিকবার গোয়েন্দা সংস্থা ও আওয়ামী লীগের নেতারা বিষয়টি শেখ হাসিনাকে জানালেও তিনি কোনো ব্যবস্থা নেননি। উল্টো তিনি অভিযোগকারীদের ধমক দেন বলে জানা গেছে। ফলে মাদক-সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে তার নীরব সম্মতি ছিল বলে মনে করা হচ্ছে।
গণভবনে বদির ‘প্রস্তাব’
গোয়েন্দা সূত্র জানায়, ২০১৮ সালের নির্বাচনের আগে কক্সবাজার-৪ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য অধ্যক্ষ মোহাম্মদ আলীর নেতৃত্বে একটি দল গণভবনে গিয়ে বদির বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলে। কিন্তু শেখ হাসিনা গুরুত্ব না দিয়ে বলেন, “আপনাদের সময়েই তো মাদক এসেছে দেশে। এখন এত কথা বলার দরকার নেই!”
এরপর ওবায়দুল কাদের বদিকে নিয়ে শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা করেন। সে সময় বদি সরাসরি বলেন, “আপা, ইয়াবা ব্যবসা সরকারের পক্ষে বন্ধ করা সম্ভব না। বরং আপনি চাইলে মাদক কারবারিদের কাছ থেকে তিনশ আসনের নির্বাচনি খরচের ব্যবস্থা করতে পারব।” শেখ হাসিনা সরাসরি কোনো সিদ্ধান্ত না দিয়ে বদিকে তার মতো কাজ চালিয়ে যেতে বলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
‘মাদক নির্মূলের নামে হত্যাযজ্ঞ’
গোয়েন্দা সূত্র জানায়, মাদক নির্মূলের নামে শত শত মানুষকে বিচারবহির্ভূতভাবে হত্যা করা হয়েছে। কিন্তু প্রকৃত গডফাদাররা থেকেছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। ইয়াবা কারবারি হাজি সাইফুল আলম আত্মসমর্পণের জন্য সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। কিন্তু জিজ্ঞাসাবাদের সময় তিনি ওবায়দুল কাদের, আসাদুজ্জামান খান কামাল ও শহিদুল হকের নাম প্রকাশ করায় ২০১৯ সালের ৩১ মে পুলিশের এক অভিযানে তাকে হত্যা করা হয়।
২০১৮ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত শুধু টেকনাফে পুলিশের তথাকথিত মাদকবিরোধী অভিযানে ১৪৪ জনকে বিচারবহির্ভূতভাবে হত্যা করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
‘সোনার ডিম পাড়া হাঁস’ ছিলেন বদি
দীর্ঘদিন কক্সবাজারসহ সীমান্তবর্তী এলাকায় ইয়াবা ব্যবসা চললেও এর প্রকৃত সুবিধাভোগী ছিলেন ক্ষমতাসীন দলের শীর্ষপর্যায়ের কিছু নেতা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা। বদির ঘনিষ্ঠজনদের দাবি, তিনি শুধু একজন মধ্যস্থতাকারী ছিলেন। সীমান্ত থেকে রাজধানী পর্যন্ত ইয়াবা সরবরাহের বিশাল চক্র নিয়ন্ত্রণ করতেন তিনি। এই চক্রের কমিশনের অংশ পেতেন ওবায়দুল কাদের, আসাদুজ্জামান কামালসহ আরও অনেকে।
‘উচ্চপর্যায়ের ছায়ায় রক্ষা পায় গডফাদাররা’
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “উচ্চপর্যায়ের কেউ জড়িত না থাকলে বদির মতো একজন ব্যক্তি সুরক্ষা পেত না, বরং শাস্তির মুখোমুখি হতো। শুধু বদি নয়, আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা ও গোয়েন্দা সংস্থার অনেকেই এতে যুক্ত ছিলেন। লাভের অংশ উচ্চপর্যায়ে পৌঁছানোর কারণেই রাষ্ট্রযন্ত্র মাদকের গডফাদারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়নি।”
‘নেতাদের আশীর্বাদে টিকে ছিল মাদক চক্র’
গোয়েন্দা তথ্য মতে, ২০১২ সাল থেকেই দেশে পরিকল্পিতভাবে মাদক-সন্ত্রাসের বিস্তার ঘটে। ২০১৪ সালে আসাদুজ্জামান খান কামাল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও শহিদুল হক আইজিপি হওয়ার পর এই চক্র আরও শক্তিশালী হয়। এরপর ২০১৮ সালে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ ঠেকানোর অজুহাতে নাফ নদীতে মাছ ধরা নিষিদ্ধ করা হয়, যাতে মাদক চোরাচালান বাধাহীনভাবে চলতে পারে।